
অদৃশ্য হস্তক্ষেপে আবারো অর্থায়ন শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক তিন ব্যাংক। বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত একটি ফ্লাইওভার প্রকল্পে সম্প্রতি ৬০০ কোটি টাকা কনসোর্টিয়াম করে অর্থায়নের প্রস্তাব সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পাস হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে।
এর আগে একই প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ থাকায় পর্ষদ সভায় পরিচালকরা নতুন অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু চেয়ারম্যানরা প্রস্তাব অনুমোদনের ব্যাপারে ওপরের চাপ আছে বলে পর্ষদকে তা পাস করার ব্যাপারে সম্মতি দিতে বলেন।
জানা গেছে, তিনটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে হলমার্ক কেলেঙ্কারির ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যে অচলাবস্থা শুরু হয়েছিল, তা কার্যত নিরসন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। তবে এসব ঋণ আদায় না হলে আবারো নতুন করে অচলাবস্থার মধ্যে পড়বে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম আমিনুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘তিনটি ব্যাংক মিলে আমরা এ প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকা
ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পর্ষদ সভায় তা
অনুমোদন পেয়েছে। ক্রমান্বয়ে আমরা প্রকল্পটিতে
অর্থায়ন করব।’
এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন না করার জন্য বিশেষ মহলের অনুরোধ থাকায় সংশ্লিষ্ট গ্রুপ ও প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরিবেশনে প্রতিবেদক বিরত থেকেছেন।
সোনালী ব্যাংকের নতুন নিয়োগ পাওয়া এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পরিচালনা পর্ষদের সভায় একটি প্রকল্পে ২০০ কোটি টাকা অর্থায়নের প্রস্তাব ওঠে। জানানো হয়, তিনটি ব্যাংক মিলে ৬০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে প্রকল্পটিতে। এতে আমরা বিরোধিতা করলেও চেয়ারম্যান ওপর মহলের নির্দেশনার কথা জানিয়ে পাস করিয়ে নেন।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘হলমার্কের ঘটনার পর আমাদের পরিচালক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু আমরা কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি না। এভাবে ওপর মহলের কথা বলে সভায় অর্থায়ন অনুমোদন করে নিলে আরো ঝুঁকির মধ্যে পড়বে খাতটি।’
প্রসঙ্গত, একই প্রকল্পে দুই বছর আগে সোনালী ব্যাংক ২০০ কোটি, জনতা ২০০ কোটি, অগ্রণী ১৫০ কোটি ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ৫০ কোটি টাকা অর্থায়ন করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের শুরু থেকে এর ব্যয় নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বেসরকারি বিনিয়োগে প্রকল্প হচ্ছে— এ রকম একটি প্রচারণা থাকলেও অধিকাংশ অর্থের জোগান আসছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক
ব্যাংক থেকেই।
নতুন আবারো একই প্রকল্পে অগ্রণী ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ সম্পর্কে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আরস্তু খান বলেন, ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানে রিফিন্যান্সিং করতে পারে। তবে ঋণগ্রহীতা যাতে ভবিষ্যতে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হয়, সে ধরনের ব্যবস্থা রেখেই ঋণ অনুমোদন দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। যেসব প্রকল্পে ব্যাংক একবার ঋণ দিয়েছিল, সেখানে কাজটি শেষ করার জন্য নতুন করে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ২১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা; যা বিতরণকৃত ঋণের ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সোনালীর ৩৩ হাজার ৯৪৯ কোটির মধ্যে ১২ হাজার ৪৫ কোটি টাকাই খেলাপি; যা ৩৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের ২৭ হাজার ৮০৮ কোটির মধ্যে ৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা খেলাপি; যা ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের ১৯ হাজার ৬৯৭ কোটির মধ্যে ৪ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা খেলাপি; যা ২৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
জানা যায়, হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ঋণ বিতরণে প্রায় অচলাবস্থা শুরু হয়। শুধু সরকারি মালিকানাধীন অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেয়া ছাড়া বাকি সব ঋণ অনুমোদনই বন্ধ ছিল। ফলে এসব ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে আসে। পরে গত ডিসেম্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় নতুন পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর এক মাস প্রায় বিভিন্ন অনিয়ম নিয়েই আলোচনা করেন পর্ষদ সদস্যরা। কিন্তু গুণগত মান যাচাই করে ঋণ দেয়ার পরিকল্পনা শুরুতেই ধাক্কা খেল। অদৃশ্য হস্তক্ষেপের চাপে নানা কারণে বিতর্কিত একটি গ্রুপের অবকাঠামো প্রকল্পে তিনটি ব্যাংক যৌথভাবে ৬০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আবারো হলমার্কের মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে কিনা, তা নিয়ে ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
Discussion about this post