বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতায় ২০১২ সালে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া ও প্রভিশন ঘাটতির মতো বিষয়গুলো তুলে ধরে খাতটি সম্পর্কে এ মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট এপ্রিল সংখ্যায় বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০১২ সালে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ৬ দশমিক ১ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রভিশন ঘাটতি ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাতও (সিএআর) ১১ দশমিক ৪ থেকে নেমে এসেছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে। এমনকি সাতটি ব্যাংক প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশ সিএআর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এ খাতে নানা অনিয়মের কারণেই মূলত খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। মার্চ শেষের হিসাবে তা ১৫ শতাংশের কাছাকাছি চলে যাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমানে যে ফল পাওয়া যাচ্ছে, তার বীজ বোনা হয় অনেক আগেই। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলো অতিমাত্রায় ঋণ দিয়েছিল। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারেনি। ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তা সবাই অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। এ থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত ও মানসম্পন্ন ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা পালনের এখনই সময়। এটা না করতে পারলে সামনে আরো খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমানতের গড় প্রবৃদ্ধি ২০ দশমিক ৫ থেকে কমে হয়েছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এতে ২০১২ সালের শুরুতে ঋণ আমানত অনুপাত ৮৬ শতাংশ থাকলেও পরে তা ৭৮ শতাংশে নেমে আসে।
জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ আছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে। হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এ খাতই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। এ থেকে উত্তরণের পথও আমাদের হাতে নেই।’
প্রতিবেদনমতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা আগের চেয়ে কমে এসেছে। দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব মানসম্পন্ন ঋণ কমে যাওয়ায় ভূমিকা রাখছে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মার্চে খেলাপি ঋণ ১২ দশমিক ১ শতাংশ থাকলেও সেপ্টেম্বরে তা ১৭ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে। এছাড়া ঋণ বিতরণে অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নগদ জমার হার (সিআরআর) ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। কলমানি বাজার থেকে ধার করে ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপো সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো দৈনন্দিন চাহিদা মেটাচ্ছে। এ অবস্থায় এসব ব্যাংক নতুন করে ঋণ প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ভালো করতে পারছে না বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশে, জুনে যা ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। মাত্র পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২০১২ সালের প্রথম নয় মাসে মুনাফা করেছে। ১৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আরএফ হোসেইন বলেন, গত ২৭ বছরে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়নি। গত বছরের শুরুতে তারল্য সংকট ছিল, সুদের হারও ছিল অনেক। বর্তমানে তা সহনীয় মাত্রায় চলে এসেছে। তারল্যও পাওয়া যাচ্ছে। তবে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা সবাইকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ঋণ আদায় না হওয়ায় অনেকে খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেই অর্থনীতি আবারো আগের অবস্থায় ফিরবে।
Discussion about this post