http://www.ntvbd.com/opinion/20229/%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%95-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%87%E0%A6%89-%E0%A6%A8%E0%A7%9F
বাংলাদেশে ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট(আইসিইউ) নামটি এখন প্রায়ই শোনা যায়। ধনীর পাশাপাশি এখন মধ্যবিত্তরাও ভাগ্য থাকলে মৃত্যুর আগে আইসিইউতে ঢু মেরে যায়। উন্নত দেশে পশু-পাখিকেও আইসিইউতে রাখার খবর মেলে পত্রিকা মারফত।
আইসিইউ প্রসঙ্গ কেন আনলাম, তার ব্যাখ্যা এবার দেওয়া যাক। বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যবিত্ত দেশের কাতারে প্রবেশ করেছে। সরকার আশা করছে দ্রুতই এ দেশ মধ্যবিত্ত দেশে পরিণত হবে। দ্রুত মানে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে। এই যে বাংলাদেশের উন্নতি, তার পুরোটাই অর্থনীতি কেন্দ্রিক। অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে, তবে এর পেছনেরও ভূমিকা রেখেছে অর্থনীতি। বাংলাদেশে অর্থনীতির দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর। ব্যাংক খাতের কারণেই আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ, ব্যবসা- সব ক্ষেত্রেই উন্নতি আবার কখনো অবনতিও হচ্ছে। যদি এই ব্যাংক খাতটি দুর্বল হয়ে পড়ে তবে নাজুক হয়ে পড়বে অন্যান্য সব খাতই। যার প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত দেশে প্রবেশের পরিকল্পনাতেও।
সোনালী, বেসিক, কৃষি, ন্যাশনালের মতো যদি একের পর একটি ব্যাংক খারাপ হতে শুরু করে তবে কেন এদের বাঁচাতে আইসিইউ খোলা হবে না, এ প্রশ্ন আজ অনেক অর্থনীতিবিদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ৫২ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা পরিশোধ করছে না এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৮১ গ্রাহক। যদিও এর মধ্যে ১০ হাজার টাকার ঋণগ্রহীতা আছে, তেমনি আছে ৫ হাজার কোটি টাকার গ্রহীতাও। এদের চাপে যেসব ব্যাংক রুগ্ন হয়ে পড়ছে, সেসব ব্যাংক বাঁচাতেই আইসিইউ খোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশে। জুন শেষে ব্যাংক খাতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৫২ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। হিসাবে দেখা গেছে, জুন শেষে অগ্রণীর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৫০৬ কোটি, বেসিকের চার হাজার ৩০৭ কোটি, জনতার তিন হাজার ৮২৫ কোটি, রূপালীর এক হাজার ৫২২ কোটি এবং সোনালীর আট হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এ সময়ে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪৭৮ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংকের এক হাজার ৬৬ কোটি, এক্সিমের এক হাজার ১৩ কোটি, ন্যাশনালের এক হাজার ৯৪ কোটি, প্রাইমের এক হাজার ৫৫ কোটি, পূবালীর ৯৭৯ কোটি, দ্য সিটির ৯৫৮ কোটি, ইউসিবিএলের এক হাজার ৪২ কোটি। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ৯২০ কোটি, স্টান্ডার্ড চার্টার্ডের ৬২৩ কোটি। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কৃষি ব্যাংকের খেলাপি চার হাজার ৩১০ কোটি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৯৭৭ কোটি।
২০১৫ সালের জুনে খেলাপি গ্রাহক দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৮১ জন। ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) ডাটাবেজ রক্ষিত হিসেবে ৫০ হাজার টাকা ও তদুর্ধ্ব বকেয়া ঋণ হিসাব এবং ১০ হাজার টাকা ও তদুর্ধ্ব ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া স্থিতিসম্পন্ন থেকে এ হিসাব পাওয়া গেছে।
ব্যাংক খাত যে দিনদিন দুর্বল হয়ে পড়ছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সূচকেই। ব্যাংকিং খাতে সম্পদের বিপরীতে আয় (রিটার্ন অন অ্যাসেট) ও শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার বিপরীতে আয় (রিটার্ন অন ইক্যুইটি) দুটোই নিম্নমুখী। বিপরীতে বেড়েছে মূলধনের অনুপাতে খেলাপি ঋণও। এ তিন সূচকের নিম্নমুখীতা খাতটিতে দক্ষতা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই সঙ্গে দুর্বল হচ্ছে বড় ব্যাংকগুলোও।
সম্পদের বিপরীতে কী পরিমাণ মুনাফা আসে, তার ধারণা পাওয়া যায় রিটার্ন অন অ্যাসেট থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে ব্যাংকিং খাতে সম্পদ থেকে আয় ছিল ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৭ শতাংশে। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে রিটার্ন অন অ্যাসেট ছিল দশমিক ৯ শতাংশ। ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা কী পরিমাণ মুনাফা পাচ্ছেন, তার হিসাব পাওয়া যায় রিটার্ন অন ইক্যুইটি থেকে। ২০১০ সালে ইকুইটি থেকে আয় ছিল ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৩ সালেও এটা ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় উভয় সূচকেই খাতটির অবনতি হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের যে মূলধন রয়েছে ২০১৪ সাল শেষে তার ৬৮ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। যদিও ২০১৩ সাল শেষে মূলধনের ৬০ শতাংশ ছিল খেলাপি। আর ২০১২ সালে তা ছিল ৭৪ শতাংশ। ব্যাংকে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের মূলধনের সঙ্গে খেলাপি ঋণের তুলনা করে এ হিসাব করা হয়েছে।
এত সব তথ্য উপাত্ত দেওয়ার উদ্দেশ্য একটিই খাতটির প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা। খাতটিকে বাঁচাতে হলে এখনই সময় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আলাদা তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে আসা। কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার উপরে যেসব খেলাপি আছে তাদের পৃথক তদারকিতে নিয়ে আসা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে অথবা সরকারের অধীনে কোনো পৃথক উইং খোলা। যারা জোর করে হলেও এদের থেকে অর্থ উদ্ধার করে দিবে। তাদের নিয়ে আসতে হবে নিবির তদারকি ব্যবস্থার মধ্যে। না হলে স্বপ্নই থেকে যাবে মধ্যবিত্ত দেশে প্রবেশের পরিকল্পনা।
লেখক : সংবাদকর্মী
Discussion about this post