ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ভ্রমণ, বিদেশী কোম্পানির মুনাফা ও দেশে কর্মরত বিদেশী কর্মীদের রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন, মেগা প্রকল্পের পরামর্শ ফিসহ সেবাসংশ্লিষ্ট ফি বাবদ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতি বছর দেশ থেকে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের বহির্গমন হয়। তবে গত ১২ মাসে (ডিসেম্বর ’১৪-নভেম্বর ’১৫) তা ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত নভেম্বরেই বহির্গমন হয়েছে ২ হাজার ৩৬৩ মিলিয়ন ডলার। এ অবস্থায় বাজারে দেখা দিয়েছে ডলার সংকট; যার প্রভাব পড়েছে খোলাবাজারের পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলেও। বেশকিছু ব্যাংক এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার চেয়েও পায়নি। তাতে বেড়ে গেছে ডলারের মূল্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কাজী ছাইদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, মেগা প্রকল্পগুলোর পরামর্শ ফিসহ বিভিন্ন কারণে এ সময়ে বেশি ডলার বাইরে গেছে। আবার ডলার এসেছেও কম। এর ফলেই কিছুটা টান পড়েছে। তবে আমরা এ সময়ে কোনো ডলার ছাড়িনি।
ব্যাংকিং চ্যানেলে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৭২৬ মিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে যায়। ফেব্রুয়ারিতে বহির্গমন হয় ১ হাজার ৪৫৫ মিলিয়ন ডলার। মার্চে আরো বেড়ে হয় ১ হাজার ৮২০ মিলিয়ন ডলার। পরের মাসগুলোয় বহির্গমনের হার কিছুটা কমে। এপ্রিলে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০২ মিলিয়ন, মে মাসে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন, জুনে ৮৩৬ মিলিয়ন, জুলাইয়ে ১ হাজার ২২০ মিলিয়ন, আগস্টে ১ হাজার ২৬৯ মিলিয়ন, সেপ্টেম্বরে ৯২৬ মিলিয়ন ও অক্টোবরে বহির্গমন হয় ১ হাজার ৬ মিলিয়ন ডলার। তবে হঠাৎ নভেম্বরে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বহির্গমন হয় ২ হাজার ৩৬৩ মিলিয়ন ডলার।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখ্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, হজ মৌসুমের কারণে চাপ পড়েছে ডলারে। পাশাপাশি বড়দিন উপলক্ষে দেশে কর্মরত বিদেশীরাও ডলার পাঠাচ্ছেন, ফলে ডলারে টান পড়েছে। তার পরও ডলারের বহির্গমন অনেক বেশি মনে হচ্ছে।
দেখা গেছে, গত ১ অক্টোবর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক নগদ ডলার বিক্রি করে ৭৯ টাকা ৮০ পয়সায়। তবে গতকাল তা বিক্রি করে ৮১ টাকা ১০ পয়সায়। এইচএসবিসিও গতকাল ডলার বিক্রি করেছে ৮১ টাকা ৫০ পয়সায়। ঢাকা ব্যাংক ১ অক্টোবর ৭৯ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করলেও গতকাল করেছে ৮২ টাকায়। এবি ও আইএফআইসি ব্যাংক গতকাল ডলার বিক্রি করেছে যথাক্রমে ৮২ টাকা ২০ পয়সা ও ৮২ টাকায়।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদ ও হজ মৌসুমের কারণে ডলারের চাপ ছিল বেশি। ফলে ব্যাংকের পাশাপাশি খোলাবাজারেও ডলারের চাহিদা বাড়ে। এ কারণে মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ১ নভেম্বর ব্যাংকিং খাতে গড়ে ডলারের বিক্রয়মূল্য ছিল ৭৮ টাকা ৫ পয়সা। তবে গতকাল তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ টাকা ৯৫ পয়সায়।
খোলাবাজারের ডলার ব্যবসায়ীরা বলছেন, অক্টোবর থেকে নগদ ডলারের সরবরাহ কম। ফলে দাম বেড়ে গেছে। আগে ৭৯ টাকায় ডলার পাওয়া গেলেও এখন কিনতে হচ্ছে ৮১ টাকার বেশি দিয়ে। ফলে এখন ৮২ টাকা পর্যন্ত প্রতি ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে।
এদিকে ডলার সংকটে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৫০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ মূল্যের মার্কিন ডলার, ইউরো ও পাউন্ড আমদানির অনুমোদন চায়। ব্যাংকটি লন্ডনের ট্রাভেলেক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এসব নোট আমদানির প্রস্তাব করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সে আবেদনে অনুমোদনও দিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আহসান উল্লাহ বলেন, আমরা বিধি অনুযায়ীই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে এ-সংক্রান্ত অনুমোদন দিয়েছি।
এর আগে ২০১০ সালের ৪ জুলাই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বিদেশী মুদ্রা আমদানির অনুমোদন চাইলেও সেবার অনুমতি পায়নি ব্যাংকটি।
বৈদেশিক মুদ্রা আমদানির ওপর শুল্কসহ অন্যান্য করারোপ থাকায় ডলার আমদানিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে অন্যান্য ব্যাংক। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা আমদানিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য কর প্রত্যাহার চেয়ে চিঠি পাঠায়। তবে এনবিআর এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।

Discussion about this post