রাজধানীর গুলশানে অগ্রাধিকার সেবার নামে বেসরকারি একটি ব্যাংক অল্পসংখ্যক গ্রাহককে পাঁচতারকা হোটেলের মতো সেবা দিচ্ছে। একই উদ্দেশে কয়েকটি ব্যাংকের কোনো কোনো শাখার অভ্যন্তরীণ সজ্জা করা হয়েছে ব্যয়বহুল। এসব বিলাস ও অপরিকল্পিতভাবে শাখা কার্যক্রম সম্প্রসারণের কারণে পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়েছে ১৬৪ শতাংশ। তবে ব্যয়ের চেয়ে আয় বৃদ্ধির হার বেশ খানিকটা পিছিয়ে। আবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ার কথা থাকলেও কর্মীপ্রতি নেট মুনাফা পাঁচ বছরের ব্যবধানে কমে গেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। এসব কারণে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাত ভারসাম্যহীনভাবে বড় হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকের জনবল বৃদ্ধি ও শাখা সম্প্রসারণে সাধারণ নিয়মাবলি না মেনে অতিরিক্ত ব্যয় করছে দেশী বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ব্যয়ের রাশ টানতে নানা উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তার সফলতা সামান্যই। বিশেষ করে ২০১০ থেকে ২০১২ এ তিন বছরে ব্যাংকগুলোর ব্যয়ের আতিশয্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০১০ থেকে ২০১১ সালে যেখানে জনবল বৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ, সেখানে ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল ৪০ শতাংশের বেশি। পরের বছরও ব্যয় বৃদ্ধির এ প্রবণতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য থেকে পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মোহাম্মদ এ রুমী আলী বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো শাখা ব্যাংকিংয়ের দিকে বেশি জোর দেয়ায় এমনটি হয়েছে। কারণ নতুন শাখা মানেই প্রয়োজন জনবল ও অবকাঠামো। অর্থাৎ ব্যয় বৃদ্ধি। যদি শাখার দিকে জোর না দিয়ে বিকল্প চ্যানেলের দিকে নজর দেয়া হতো, তাহলে এ ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতো না। কর্মীপ্রতি আয়ও কমে যেত না, দক্ষতার বিষয়টিও সামনে আসত না। তবে বর্তমানে মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে জোর দেয়ায় পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০০৮ সালে দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের আয় ছিল ২১ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। ২০১২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ২২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে আয় বেড়েছে ১৪৬ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর আয়ের উত্স ছিল মূলত বৈদেশিক বাণিজ্য, রেমিট্যান্স সংগ্রহ, শিল্প ও ক্ষুদ্র ঋণ। তবে ওই সময়ে (২০০৮-১২) ব্যাংকিং খাতের আয়ের চেয়ে ব্যয়ের হার বেড়ে যায়। ব্যয়ের এ হার বাড়ার অন্যতম কারণ— নতুন নতুন শাখা স্থাপন ও দেশের বাইরে এক্সচেঞ্জ হাউস খোলা। ২০০৮ সালে বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ছিল ২ হাজার ৮২টি, ২০১২ সালে তার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৩৯টি। পাঁচ বছরে শাখা বাড়ে ১ হাজার ২৫৭টি। আবার একই সময়ে ব্যাংকগুলো যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, গ্রিস, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি ও মালদ্বীপে ২২টি এক্সচেঞ্জ হাউস চালু করে; যার বেশির ভাগই লোকসান গুনছে। এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে জনবল বৃদ্ধি হয় ৭৭ শতাংশ। ২০০৮ সালে ব্যাংকিং খাতে কর্মী ছিল ৪৬ হাজার ৩০৮ জন। ২০১২ সালে তা দাঁড়ায় ৮১ হাজার ৯৪৪ জনে। ২০০৮ সালে ব্যাংকগুলোর ব্যয় ছিল ১৪ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। ২০১২ সালে তা দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে পাঁচ বছরে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ব্যয় বাড়ে ১৬৪ শতাংশ।
একাধিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন নতুন শাখা স্থাপন, জমি কেনা, এক্সচেঞ্জ হাউস প্রতিষ্ঠা আর অটোমেশনের নামেই বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে। এতে লাভবান হয়েছেন অনেক ব্যাংকের পরিচালক। এসব কারণে কর্মীপ্রতি মুনাফা কমে গেছে। পাশাপাশি যোগ্য কর্মী ধরে রাখতেও ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়েছে। ফলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ধরে রাখা যায়নি।
তবে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, এ সময়ে প্রযুক্তি খাতে ব্যাংকগুলো অনেক ব্যয় করেছে আর কর্মীদের সুবিধাও প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রযুক্তি স্থাপন করেও নানা চাপে জনবল কমানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে কর্মীপ্রতি আয় কমেছে।
২০০৮ সালে ব্যাংকগুলোর কর-পরবর্তী নেট মুনাফা হয় ২ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা, ২০১২ সালে যা হয় ৩ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে নেট মুনাফা বাড়ে ৪০ শতাংশ। তবে এ সময়ে কর্মীপ্রতি আয় কমে প্রায় ৩৩ শতাংশ। এ হিসাবে কর্মীর দক্ষতা কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
এসব প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার বলেন, অনেক ব্যাংকই পরিকল্পনা বিবেচনা না করে বেশি জনবল নিয়োগ দিয়েছে, ফলে কর্মীপ্রতি আয় কমে গেছে। এজন্য নানা ধরনের বিশ্লেষণ ও সামর্থ্য পরিকল্পনা করে অগ্রসর হতে হবে। এক্ষেত্রে চলতি বছর ব্যাংকগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকবে ব্যয় কমানোর।
প্রসঙ্গত, ব্যাংকের ব্যয় কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি পর্ষদ চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী ও অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তার জন্য বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় নিরুত্সাহিত করতে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। একই সঙ্গে উচ্চব্যয়ের লাগাম টানতে ব্যাংক শাখার চাকচিক্যপূর্ণ সাজসজ্জায় ব্যয় কমিয়ে আনারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2014/01/20/29525#sthash.d3LOHMtg.dpuf
g
Discussion about this post