বিনিয়োগ হবে সুদমুক্ত; লাভ-লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে। এটিই ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি। যদিও এ খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের এ পদ্ধতিতে বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ। বরং বিনিয়োগের ওপর নির্দিষ্ট মুনাফা ধরে দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে গ্রাহকের ওপর। ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের প্রায় পুরোটাই হচ্ছে এ পদ্ধতিতে; যা সুদবিহীন ধারণার পরিপন্থী।
জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে দুই পদ্ধতিতে— আল ওয়াদিয়া ও মুদারাবা। আল ওয়াদিয়া পদ্ধতিতে কোনো মুনাফা দেয়া হয় না। আর মুদারাবা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ থেকে মুনাফা এলে আমানতকারীকে তার অংশ দেয়া হয়। লোকসান হলে গ্রাহকের আমানত থেকে কেটে নেয়া হয়। তবে পরিচালন ব্যয়ের নামে ব্যাংক কোনো লোকসানের ভাগ নেয় না।
ইসলামী ব্যাংকের ২০১৪ ভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটিতে আল ওয়াদিয়া বা সুদবিহীন আমানতের পরিমাণ ৫ হাজার ৮০১ কোটি টাকা। আর মুদারাবা পদ্ধতিতে আমানতের পরিমাণ ৫০ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। যদিও লাভ-লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ মাত্র ৫৮২ কোটি টাকা; মোট বিনিয়োগের যা মাত্র ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতিতে এ বিনিয়োগ হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ইসলামী ব্যাংককে অনুমোদন দেয়া হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যবসা করার জন্য। তারা আমানত নিচ্ছে মুনাফা-লোকসান অংশীদার ভিত্তিতে, যা শরিয়াহভিত্তিক। তবে বিনিয়োগ করছে নির্দিষ্ট সুদের ওপর। শুধু মুশারাকা ও মুদারাবায় মুনাফা-লোকসান অংশীদার ভিত্তিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২ শতাংশও নয়। তাই কোন পদ্ধতিতে কত শতাংশ বিনিয়োগ হবে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য তা নির্দিষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ মুশারাকা ও মুদারাবায় হওয়া উচিত।
তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে জানার অভাব আছে। লোকসান ভাগাভাগি হলেই ইসলামী আর ব্যবসা হলে ইসলামী না, বিষয়টি এমন নয়। আমরা লাভ-লোকসান ভাগাভাগি পদ্ধতিতে বিনিয়োগ এখনো করছি, সেটা গ্রামীণ এলাকায়। কারণ আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। বেশি মুনাফা হলে ব্যাংককে দিতে হবে। এ কারণে যারা ভালো ব্যবসা করছেন, তারা এ পদ্ধতিতে বিনিয়োগ নিতে আগ্রহী নন। তবে এটা ঠিক, আমরা যদি ৫ শতাংশ বিনিয়োগ এ পদ্ধতিতে করতে পারতাম, তাহলে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে মানুষ প্রকৃত তথ্য আরো ভালোভাবে জানতে পারত।’
এদিকে সুদহীন ব্যবসার নামে প্রতারণার অভিযোগে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন চট্টগ্রামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক বিনিয়োগের প্রচার করেও তা না মানার অভিযোগে গত ২ আগস্ট চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন মেসার্স ইউসুফিয়া আয়রন মার্টের স্বত্বাধিকারী মো. ইসমাইল মহিউদ্দিন।
মামলার বিবরণীতে বলা হয়, ২০১১ সালে ইসলামী ব্যাংক চট্টগ্রাম স্টেশন রোড শাখা থেকে ১ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক পণ্য ও ফার্নিচার আমদানি করে ইউসুফিয়া আয়রন মার্ট। মূল বিনিয়োগের ৮০ শতাংশ ব্যাংক ও ২০ শতাংশ আমদানিকারক বহন করার শর্তে পণ্য আমদানির পর তা ব্যাংকের নিজস্ব গুদামে রাখা হয়। আনুপাতিক লাভ-লোকসানের অংশীদারি চুক্তি থাকার পরও ব্যাংক বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত লভ্যাংশ দাবি করে। বাদী তাতে রাজি না হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গুদামে রক্ষিত প্রায় ৬০ শতাংশ পণ্য অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। পাশাপাশি অর্থ আদায়ে বন্ধকি জমি নিলামে তুলতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
বাদীর দাবি, শরিয়াভিত্তিক বিনিয়োগের নামে ইসলামী ব্যাংক তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রতারণার ওই মামলা করেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতি ছাড়া বিনিয়োগের সব ক্ষেত্রেই ১৪ শতাংশ মুনাফা ধরে হিসাব করা হয়। সব নথিপত্র তৈরি করা হয় এভাবেই।
ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো প্রধানত অংশীদার, মালিকানায় অংশীদারের ভিত্তিতে ভাড়া নেয়া ও ক্রয় এবং বেচাকেনা— এ তিন পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকও এ কৌশলে বিনিয়োগ করে। এর মধ্যে অংশীদার পদ্ধতিতেই শুধু লাভ-লোকসান ভাগাভাগি হয়।
লাভ-লোকসান ভাগাভাগির একটি পদ্ধতি হচ্ছে মুদারাবা। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক মূলধন জোগান দেয়। গ্রাহক শ্রম, মেধা ও সময় ব্যয় করে চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা নেয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকের অবহেলাজনিত ক্ষতি ছাড়া অন্য কোনো কারণে লোকসান হলে ব্যাংক তা বহন করে। এ পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ ৩০০ কোটি টাকা; মোট বিনিয়োগের যা মাত্র দশমিক ৬৫ শতাংশ।
মুশারাকাও মূলত অংশীদারভিত্তিক বিনিয়োগ। এতে দুই বা ততোধিক পক্ষ মূলধন জোগান দেয়। মুনাফা বা লোকসান হলে চুক্তি অনুযায়ী তা ভাগাভাগি করে নেয়া হয়। মুশারাকা পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে ২৮২ কোটি টাকা। এ পরিমাণ ব্যাংকটির মোট বিনিয়োগের দশমিক ৬১ শতাংশ।
এর বাইরে মালিকানায় অংশীদার ভিত্তিতে ভাড়া নেয়া ও ক্রয় পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে ১০ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা; যা মোট বিনিয়োগের ২৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক ও গ্রাহক মূলধন জোগান দিয়ে কোনো সম্পত্তির মালিকানা অর্জনের পর চুক্তির মাধ্যমে ভাড়া ও বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের পর গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে।
বেচাকেনা পদ্ধতিতে বাই-মুরাবাহ পদ্ধতিটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাই-মুরাবাহ অর্থ লাভে বা মুনাফায় বিক্রয়। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক গ্রাহকের অনুরোধে পণ্য কিনে তার সঙ্গে মুনাফা ধরে আবার গ্রাহকের কাছেই বিক্রি করে; গ্রাহক যা পরে কিস্তিতে পরিশোধ করেন। বাই-মুরাবাহ পদ্ধতিতেই ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকটির বিনিয়োগের ৬০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বিনিয়োগ এ পদ্ধতিতে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ২৮ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।
বাই-মুয়াজ্জাল পদ্ধতিতে ব্যাংক পণ্য কিনে তার ওপর মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার পর মুনাফা ধরে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। নির্দিষ্ট কিস্তি শোধ হওয়ার পর পণ্য গ্রাহকের হয়ে যায়। এতেও কিস্তি নির্ধারিত হয় মুনাফা ধরে। ব্যাংকটির বিনিয়োগের ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এ পদ্ধতিতে; যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।
বাই-সালাম হলো অগ্রিম কেনাবেচা। এ পদ্ধতিতে ভবিষ্যতে নির্ধারিত কোনো সময় পণ্য সরবরাহের শর্তে ও তাত্ক্ষণিক সম্মত মূল্য পরিশোধসাপেক্ষ পণ্য ক্রয় করা হয়। এ পদ্ধতিতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ ৪৮০ কোটি টাকা; মোট বিনিয়োগের যা ১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।
যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকটির সাবেক এমডি ও এক্সিম ব্যাংকের উপদেষ্টা এম ফরিদউদ্দিন বলেন, জনগণের অর্থ নিয়ে মুশারাকায় বিনিয়োগ করে ব্যাংক লোকসান গুনবে, এটা কী করে হয়? তাহলে তো ব্যাংকই টিকবে না। ইসলামী ব্যাংকে কোনো ধরনের সুদের হিসাব হয় না, সব ব্যবসা হয়; বেচাকেনা হয়। এটাই ইসলামী ব্যাংকিং। তবে কিছু অংশ মুশারাকা করা প্রয়োজন। তাহলে প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের ফারাকটা স্পষ্ট হবে।


Discussion about this post