গত এক অর্থবছরে প্রবাসীরা যে অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন, সেই অর্থে দেশে সাতটি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পদ্মা সেতু তৈরিতে ব্যয় হবে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রবাসী আয় দিয়ে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো ১০টি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে।
অথচ বিমানবন্দরে প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি, বিদেশ যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের হয়রানি এখনো চলছেই। বিমান টিকিট পাওয়ার জন্য গভীর রাত থেকে অপেক্ষার চিত্র বদলায়নি। আর দেশে ফেরত প্রবাসী শ্রমিকদের করোনার টিকা পাওয়ার জন্য কত কষ্ট করতে দেখা গেল।
বিদায়ী অর্থবছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। এই আয় এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১ হাজার ৮০৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে মোট আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ রপ্তানি আয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
প্রবাসী আয় বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ব্যাংকার ও এক্সচেঞ্জ হাউসের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, বৈশ্বিক যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে অবৈধ চ্যানেল বা উপায়ে (হুন্ডি) অর্থ পাঠানোও একেবারে কমে গেছে। অন্যদিকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পাঠালে ২ শতাংশ প্রণোদনা মিলছে। ফলে প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠানোয় মনোযোগ দিয়েছেন।
জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির বৈশ্বিক কোনো কারণ নেই। বেড়েছে দেশীয় কারণে। সেটা হলো অবৈধ চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে সরকার ২ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। এ কারণে যাঁরা আয় পাঠাচ্ছেন, সবই বৈধ পথে আসছে। প্রকৃতপক্ষে করোনায় আয় আসা কিন্তু কমেছে। কারণ, প্রবাসীদের আয় কমে গেছে।
আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, এখন থেকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, অনেক শ্রমিক চলে এসেছেন। আবার যাওয়াও কমে গেছে। এভাবে চললে প্রবাসী আয় কমে যেতে শুরু করবে।
করোনার মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। এর ফলে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে থাকা প্রবাসীদের স্বজনেরা করোনার আর্থিক প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছেন।
এদিকে রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত নতুন উচ্চতায় উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫৩৮ কোটি ডলার। এর আগে গত মে মাসের শুরুতে রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। মাঝে ৪৬ বিলিয়ন ডলারও ছাড়িয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৭৪৫ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংক ২৮২ কোটি ডলার, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২৪৯ কোটি ডলার, সোনালী ব্যাংক ১৫২ কোটি ডলার ও ব্যাংক এশিয়া ৯৭ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এনেছে।
প্রবাসী আয় সংগ্রহে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এগিয়ে থাকা প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবাসী আয় সংগ্রহে আমরা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বাড়িয়েছি। আর বিতরণের জন্য দেশের ভেতরে চ্যানেল প্রতিনিয়ত বাড়ানো হচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং ইউনিয়নে ও গ্রামে পৌঁছে গেছে। এর ফলে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা পেতে এখন কাউকে দূরে যেতে হচ্ছে না। এ কারণে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে আয় আসা বেড়েছে।’
২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার দেশে প্রবাসী আয় পাঠানোর বিপরীতে ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করে। এরপর থেকেই বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়তে শুরু করে। এদিকে করোনার মধ্যে আমেরিকা থেকে আয় আসা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আর কমেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আয়। ২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত আয় পাঠানো শীর্ষ দেশের মধ্যে সৌদি আরবের পর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০১৯-২০ সাল থেকে সৌদি আরবের পরই আয় বেশি আসছে আমেরিকা থেকে।
এ নিয়ে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এমডি গোলাম আউলিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন কম খরচে প্রবাসী আয় আনার ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া আয় পাঠানোর পথকে আরও সহজ করা প্রয়োজন। আমরা ই-কেওয়াইসি’র মাধ্যমে প্রবাসীদের হিসাব খোলার ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহজেই প্রবাসী আয় বিতরণ হচ্ছে।’

Discussion about this post