একে একে গা-ঢাকা দিচ্ছেন ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীরা। বছরের পর বছর বিশ্বাসে ভর করে গড়ে ওঠা এ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে প্রতারণার অশুভ ছায়া যেন গাঢ় হচ্ছে দিন দিন। গত তিন দশকে যে সংখ্যক ব্যবসায়ী খাতুনগঞ্জ ছেড়ে পালিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কয়েক গুণে। ২০০৮ সালের আগের ৩০ বছরে যত টাকা প্রতারণা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে প্রতারণার অঙ্ক তার পাঁচ গুণ। ফলে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের তৈরি হয়েছে এক রকম অনাস্থা; যার প্রভাব পড়েছে পুরো চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবমতে, চলতি বছর সঞ্জিত মল্লিক ৪ কোটি, গত বছরের শেষের দিকে এমকে ট্রেডার্স ১২ কোটি, মা এন্টারপ্রাইজ ৩৭ কোটি, গৌরী স্টোর ৪ কোটি, শাহজালাল স্টোর ৮ কোটি ও দেবু মহাজন ২১ কোটি টাকা ঋণ রেখে পালিয়ে যান। ২০১২ সালে গোবিন্দ স্টোর ৩ কোটি, শাহ আলম ৫ কোটি, ২০১১ সালে রিজিয়া স্টোর ২ কোটি, বাবুল স্টোর ৬ কোটি, চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ ১৪৫ কোটি, পায়েল ট্রেডার্স ৯০ কোটি, মামুন আড়াই কোটি, খোরশেদ সাড়ে ৩ কোটি, আলম তারা ৩০ কোটি, লোকনাথ স্টোর ৩ কোটি, শাহজাহান স্টোর ২৪ কোটি, মুসা ব্রাদার্স ২১ কোটি, রবিউল ট্রেডিং ২ কোটি ও নুরুল আলম ৯০ কোটি টাকা ঋণ রেখে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
শুধু খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নন, চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠিত বড় করপোরেট মালিক নূরজাহান গ্রুপ, মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্স, ছিদ্দিক ট্রেডার্স, মোস্তফা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানও রীতিমতো বিশাল অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী রেখেছে। ঋণখেলাপি মামলায় এরই মধ্যে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও এ পর্যন্ত কেউ আটক হননি।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এবিবির সর্বশেষ সভায় আলোচনা হয়েছে, চট্টগ্রামের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পেতে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো সিন্ডিকেট করবে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠান চালু করে আর কিছু সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকের দেনা শোধের উদ্যোগ নেয়া হবে। এবিবির পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেকেই অর্থ নিয়ে ব্যবসা না করে অন্যত্র বিনিয়োগ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। ফলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা হলেও ক্ষতি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা অর্থ নিয়ে গা-ঢাকা দেবেন, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। এজন্য আমরা সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মাসুম কামাল ভুঁইয়া বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা মেনে অর্থায়ন না করার কারণেই গ্রাহকরা গা-ঢাকা দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত বন্ধক থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। এখন ব্যাংকগুলোকেই গা-ঢাকা দেয়া গ্রাহকদের খুঁজে বের করে অর্থ আদায় করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ কয়েকটি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপকরা বলছেন, ‘২০১০-১২ সাল পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন করা হয়েছে আস্থার ওপর ভিত্তি করে। এ সময় অনেকের কাছ থেকেই পর্যাপ্ত জামানত নেয়া হয়নি। বেশি মুনাফার আশায় অনেক ব্যাংকই বেশি বিনিয়োগ করে এ সময়ে। ভোগ্যপণ্যের মূল্য পড়ে যাওয়া ও অনেকে অর্থ স্থানান্তর করে জমি কেনার কারণে বিপাকে পড়তে হয়েছে আমাদের। জমির দাম বাড়লে একসময় এ অর্থ আদায় হলেও যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহসা কাটবে না।’
জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে প্রায় ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা দেনা রেখে অন্তত ২২টি প্রতিষ্ঠান লাপাত্তা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালের প্রথম দিকে ঘটেছে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক প্রতারণার ঘটনা। ডিজঅনার চেক আর বাকির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে সপরিবারে কানাডা পাড়ি জমিয়েছেন ইয়াছির এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোজাহের হোসেন।
এ ধরনের আত্মগোপন ও প্রতারণা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, যুগের পর যুগ খাতুনগঞ্জে বিশ্বাসের ওপর ব্যবসা-বাণিজ্য চলে আসছে। কিন্তু অর্থ আত্মসাৎ, চেক জালিয়াতি, ডিও জালিয়াতির ঘটনায় এখন ব্যবসায়ীরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
প্রতারণার শিকার কিং ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী পরিতোষ মহাজন বলেন, ‘প্রতারকরা গা-ঢাকা দেয়ার পর টাকা তো পাই-ই না। বরং সমঝোতার জন্য ব্যবসায়ী নেতাদের পেছনে দৌড়ানো ও আদালতে মামলা করতে গিয়ে উল্টো টাকা খরচ করতে হয়।’
– See more at: http://www.bonikbarta.com/last-page/2014/03/10/34414#sthash.8ePnvzoX.dpuf
Discussion about this post