এক যুগ আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিনিয়োগ করেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি স্টিল ও রি-রোলিং মিলের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন অনেকেই। ব্যাংকগুলোও এ সময় বেশি মুনাফার আশায় এক রকম বন্ধকি ছাড়াই তাদের অর্থায়ন করে। এ অর্থায়নই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকের জন্য। একের পর এক খেলাপি হয়ে পড়ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। অনেকে কার্যালয়ও গুটিয়ে ফেলেছেন।
বণিক বার্তার নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রি-সাইক্লিংয়ের কাছে অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি শাখা ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ১১২ কোটি টাকা। আহমেদ মুজতবা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে এনসিসি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ও ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ৬৩ কোটি ও সাকিব স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ঢাকা ব্যাংক সিডিএ এভিনিউ শাখার পাওনা ৩১ কোটি টাকা। ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করার পর সব ধরনের সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো অর্থ আদায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে।
এদিকে খেলাপি হয়ে কোনো কোনো ব্যবসায়ী কার্যালয়ও গুটিয়ে ফেলেছেন। ব্যাংক ও শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের নথিপত্রে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান মুহিব স্টিল, আহমেদ মুজতবা স্টিল ও সাকিব স্টিলের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদের নূর চেম্বার। গতকাল ওই ঠিকানায় গিয়ে উল্লিখিত কোনো প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে মুহিব স্টিল ও সাকিব স্টিলের স্বত্বাধিকারী হিসেবে নাম রয়েছে মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের। আহমেদ মুজতবা স্টিলের স্বত্বাধিকারী হিসেবে রয়েছে তার ভাই মুজিবুর রহমান মিলনের নাম। এ তিন প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বি রহমান শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ ও সিলভা শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের ঠািকানাও একই। প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়া নম্বরে ফোন করলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।
যোগাযোগ করা হলে নূর চেম্বারের তত্ত্বাবধায়ক রহমত উল্লাহ জানান, এসব নামে কোনো প্রতিষ্ঠান কখনো ভবনটিতে ছিল না। প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকঋণ ফাঁকি দিতে হয়তো ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছে। তবে শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা জানান, শিপ ব্রেকিং ব্যবসায় লোকসান দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। ব্যাংকঋণের কারণে তারা অনেকটা দেউলিয়া। তাদের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা নেই।
একটা সময় সব ব্যাংকই এসব খাতে বিনিয়োগ করেছে। এর সুযোগও নিয়েছে কেউ কেউ— এমন মন্তব্য করে এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছি। তার বড় কারণ, এসব ঋণের বিপরীতে বন্ধকি তেমন নেই। চট্টগ্রামে ব্যবসা ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধকি ছাড়া। জাহাজ ভাঙা ও ইস্পাত খাতের অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণ নিয়ে আবার শুরু করতে চান। তবে বন্ধকি না থাকায় ব্যাংকগুলো সে ব্যাপারে আগ্রহী নয়।’
প্রাইম ব্যাংকের এমডি এহসান খসরুও একই সুরে বলেন, চট্টগ্রামে এসব খাতে ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা না করে বিশ্বাসকে ব্যবস্থাপনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বাসের ওপর ভর করে পছন্দের ব্যক্তিদের ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এ বিশ্বাসই ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এজন্য ব্যাংকাররাই দায়ী।
এদিকে আবার লোকসানে পড়ায় আম্বিয়া গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কিউএস ও আবরার স্টিলের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রামের বড় এ শিল্প গ্রুপের স্বত্বাধিকারী আবুল হাশেম রাজা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বেশি দামে পুরনো জাহাজ কিনে কম দামে ইস্পাত বিক্রি করায় অনেক টাকা ক্ষতি হওয়ায় কিছু ব্যাংকঋণ খেলাপি হয়েছে। আমরা খুব দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে এ অর্থ সমন্বয় করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে জাহাজ ভাঙা শিল্পের ১০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি মামলা হয়। এর মধ্যে মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিংয়ের বিরুদ্ধে অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি শাখা ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১১২ কোটি টাকা, চিটাগাং ইস্পাত লিমিটেডের বিরুদ্ধে অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি শাখা, পূবালী ব্যাংক সিডিএ শাখা ও ন্যাশনাল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ১২৪ কোটি, ন্যাশনাল আয়রন অ্যান্ড স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১৬০ কোটি, আহমেদ মুজতবা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের এনসিসি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ও ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ৬৩ কোটি, এসএম স্টিল গ্যালভাইনাইজিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ৪৩ কোটি, কিউএস স্টিলের ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৩২ কোটি, সাকিব স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের ঢাকা ব্যাংক সিডিএ এভিনিউ শাখা ৩১ কোটি, এইচ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ১৯ কোটি, আবরার স্টিলের ব্যাংক এশিয়া আগ্রাবাদ শাখা ১৬ কোটি ও আলভি স্টিল এন্টারপ্রাইজের ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯১৫ টাকা আদায়ে মামলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংক চট্টগ্রামের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, নিম্নমানের পুরনো জাহাজ আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশী বাজারে স্ক্র্যাপের দাম কমে যাওয়ায় এ শিল্প মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ কেউ আবার ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়েও ফেলেছেন। তাই সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংকগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক এ ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে একই মত পোষণ করে পূবালী ব্যাংকের এমডি হেলাল আহমেদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের একজন গ্রাহকের কাছেও এ খাতে অর্থ আটকে গেছে। তবে তিনি ঋণ পুনঃতফসিল করার চেষ্টা করছেন।’
জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ও কুমিরার সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১৮০টি জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান ছিল। ব্যবসায়িক মন্দায় চার-পাঁচ বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ৭০-৭৫টির মতো ইয়ার্ড খোলা রয়েছে। তবে কাজ চলছে মাত্র ৮-১০টিতে। হরতাল-অবরোধের কারণে দু-তিন মাস ধরে সেগুলোয়ও কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে আমদানি করা জাহাজ ইয়ার্ডে এনে ভাঙা পর্যন্ত প্রতি টনে খরচ পড়ে ৪১-৪২ হাজার টাকা। আর জাহাজ ভাঙা প্লেটের বাজারমূল্য প্রতি টন মাত্র সাড়ে ৩১ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি টন ইস্পাতে প্রায় ৫-৮ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ইস্পাত শিল্পে যে কাঁচামালের প্রয়োজন, জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলোয় তার চেয়ে বেশি উৎপাদন হওয়ায় দর কমে গেছে। তাই কয়েক বছর ধরে জাহাজ ভাঙা শিল্পে চরম মন্দা চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পুরনো জাহাজের দাম বাড়তির দিকে থাকলেও দেশের বাজারে স্ক্র্যাপের দাম কমে যাওয়ায় জাহাজ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোয় এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. হেফাজেতুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, জাহাজ ভাঙা একসময় সম্ভাবনাময় খাত ছিল। শুরুর দিকে মাত্র ২০-২৫টি বড় শিল্প গ্রুপ এ ব্যবসা শুরু করে। পরে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান এতে বিনিয়োগ করে। এ সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পুরনো জাহাজের দাম বাড়তে থাকে। কিন্তু কমতে শুরু করে ইস্পাতের দাম। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
তবে আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি শাহ আলম সারওয়ার মনে করেন, অনেকেই ঋণের অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তর করেছেন। এতে বেশি মুনাফার লোভে জাহাজ ভাঙা ও ইস্পাত শিল্পে অর্থায়ন করা ব্যাংকগুলো বিপাকে পড়েছে।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2014/01/13/28866#sthash.A1K4cC2s.dpuf
Discussion about this post