ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়া এবং এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানার অপেক্ষায় রয়েছে গোটা দেশ। আজ সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বেলা ১১টায় এ সংবাদ সম্মেলন করবেন তিনি।
জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমের সঙ্গে গতকাল দীর্ঘ বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়ার ঘটনায় দোষীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তদন্তকাজ যাতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয় তা নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে।
অর্থমন্ত্রী গতকাল দুপুরে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন তিনি। এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আতিউর রহমানের অপেক্ষায় আছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব বলেছিলাম, আলোচনা আমার হয়েছে। ডেফিনেটলি দেয়ার উড বি চেইঞ্জেস। এত বড় একটা সিরিয়াস ব্যাপার। আই টেক ইট ভেরি সিরিয়াসলি।’
এ বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার। ফলে ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় বর্তমান গভর্নর দায়িত্বে থাকলে তদন্ত সঠিকভাবে হবে কিনা সে বিষয়টিও ভেবে দেখা হচ্ছে।
গতকাল মিডিয়াপাড়ার আলোচনার মূল বিষয় ছিল গভর্নরকে নিয়ে। মন্ত্রিসভায় তার বিষয়ে কী আলোচনা হলো, গভর্নরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী কী আলোচনা করেছেন, অর্থমন্ত্রীই বা কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন— এসবই ছিল আলোচনার বিষয়।
এ আলোচনার মধ্যেই গতকাল বিকালে দিল্লি সফর শেষে ঢাকায় ফেরেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। অর্থমন্ত্রীর দফতর থেকে গভর্নরকে মন্ত্রীর দফতরে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বাসায় চলে যান গভর্নর।
রিজার্ভের অর্থ খোয়া যায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, তারা এ অর্থের মালিক হলেও অর্থমন্ত্রী, অর্থ সচিব ও ব্যাংকিং সচিবকে তা জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি গভর্নর। গত এক মাসের বেশি সময়ে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সে দেশের সরকার অনেক উদ্যোগ নিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। বরং বাংলাদেশ ব্যাংক সত্য-মিথ্যা বলে সরকারকে বিভ্রান্ত করেছে।
এ নিয়ে গত রোববার সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, ঘটনাটা এক মাস আগে ঘটলেও তা আমাকে না জানানোর যে ধৃষ্টতা বাংলাদেশ ব্যাংক দেখিয়েছে ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে ভীষণ অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তহবিল হস্তান্তর-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চাওয়া হবে।
রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়া পরবর্তী বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী ওইদিন আরো বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকলাপে আমি অখুশি। তারা যেভাবে বিষয়টি হ্যান্ডল করছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে।
গভর্নর বিদেশ থাকা অবস্থায় গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এ ঘটনায় যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের উচিত ছিল ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রণালয়কে জানানো। কিন্তু তারা তা জানায়নি। এটি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেন এটি হলো ও এ ঘটনায় কারা দায়ী, তা খুঁজে বের করতে ব্যাংকিং বিভাগ উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করবে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংকিং বিভাগ সিদ্ধান্ত নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল বলেই এটি সম্ভব হয়েছে বলেও ওইদিন মন্তব্য করেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব। তিনি বলেন, ‘এটি আইটিনির্ভর কাজ। আমরা ডিজিটাইজেশনের দিকে যাচ্ছি। অটোমেশন, ডিজিটাইজেশনে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের জনবলকেও ওইভাবে প্রশিক্ষিত হতে হবে। সেটা হয়নি। না হওয়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে।’
এ ঘটনায় সরকারের অবস্থান কী জানতে চাইলে এম আসলাম আলম বলেন, ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এ বিষয়ে কাজ করছি আমরা। এ ঘটনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আইটি নিরাপত্তা। এটা শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য নয়, সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য।’
উল্লেখ্য, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে খোয়া গেছে মোট ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার জমা হয় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) চারটি হিসাবে। সেখান থেকে পরবর্তীতে কয়েক হাত ঘুরে ওই অর্থের কিছু অংশ যায় ক্যাসিনোয়।
এ ব্যাপারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব রোববার বলেন, ফিলিপাইনে যে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টিম আছে, তারা সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ করেছে জানিয়ে এম আসলাম আলম বলেন, সেখান থেকে ৬৮ হাজার ডলার ফেরত পাওয়া গেছে। বাকি অর্থ ফেরত পাওয়া যাইনি। তবে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিচ্ছে। আর আমাদের এখান থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ফরেনসিক এক্সপার্ট নিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব সিস্টেম আছে, সেগুলো তারা পরীক্ষা করছে। এটার কাজ এখনো চলমান আছে। আরো কিছুদিন সময় লাগবে সব কম্পিউটার পরীক্ষা করতে।
এম আসলাম আলম আরো জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, অ্যাকাউন্ট থেকে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির চেষ্টা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৫ কোটি ডলার ঠেকানো গেছে। বাকি ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার প্রসেসড হয়ে ফিলিপাইন ও শ্রীলংকায় গিয়েছিল। শ্রীলংকায় পাচার হওয়া ২ কোটি ডলার ঠেকানো গেছে, যার মধ্যে ১ কোটি ৯৯ লাখ ডলার ফেরত এসেছে। এরই মধ্যে তা নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।’

Discussion about this post