ঢাকা ট্রেডিং হাউজের মূল ব্যবসা ছিল ভোগ্যপণ্য। এ ব্যবসার নামেই সরকারি-বেসরকারি ১০টি ব্যাংক থেকে ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার টিপু সুলতান। যদিও তা বিনিয়োগ করেন পরিবহন ব্যবসা টিআর ট্রাভেলসে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা। এতে বিপাকে পড়েছে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো। এ ব্যবসায়ীর কাছে আটকে গেছে তাদের বড় অঙ্কের এ ঋণ।
ঢাকা ট্রেডিং হাউজ ও টিআর ট্রাভেলস দুটি প্রতিষ্ঠানেরই চেয়ারম্যান টিপু সুলতান। ঢাকা ট্রেডিং হাউজ লিমিটেড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতেই ঢাকা ট্রেডিং নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এ ব্যবসায়ী। সব প্রতিষ্ঠানেরই কার্যালয় রাজধানীর পুরানা পল্টনের বায়তুল খায়ের ভবনের ১২ তলায়।
সরেজমিন দেখা যায়, পাঁচ-ছয়টি চেয়ার, দুটি টেবিল ছাড়া কার্যালয়টিতে আর কিছু নেই। কর্মচারী রয়েছেন চার-পাঁচজন। টিপু সুলতানের নিজের জন্য একটি কক্ষ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি আসেন না সেখানে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করাও তাই সম্ভব হয়নি।
তবে ঢাকা ট্রেডিং হাউজের মহাব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আপাতত পরিবহন ও জুট মিলের ব্যবসা চালু আছে। চেয়ারম্যান ব্যাংকঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছেন।
বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, টিপু সুলতানের প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন দাঁড়িয়েছে ৬০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪২২ কোটি টাকা এরই মধ্যে ক্ষতিজনক মানে খেলাপি হয়ে গেছে। খেলাপি হওয়ার পথে রয়েছে বাকি অর্থায়নও। খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের মধ্যে রয়েছে— সাউথইস্ট ব্যাংকের ৩৫ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) ৭৬ কোটি, জনতা ব্যাংকের ২৮০ কোটি, এবি ব্যাংকের ৬১ কোটি ও ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি টাকা। কয়েকটি ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলাও করেছে।
টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বেসরকারি খাতের সাউথইস্ট ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শহীদ হোসেন বলেন, ঋণ আদায় না হওয়ায় মামলাটি করা হয়েছে।
টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবি ব্যাংকও। বগুড়ার অর্থঋণ আদালতে মামলাটি করেন ব্যাংকের বগুড়া শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম আজাদ।
এবি ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মহাদেব সরকার সুমন বলেন, ‘প্রচলিত নিয়মে অর্থ আদায় করতে না পারায় আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় গেছি। মামলা এখনো চলছে।’
এদিকে ব্যবসায়ী টিপু সুলতানের ঋণ এখনো নিয়মিত দেখাচ্ছে কয়েকটি ব্যাংক। এর মধ্যে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ২ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩০ কোটি, ইউসিবিএলের ৩ কোটি, প্রাইম ব্যাংকের ৩ কোটি ও এক্সিম ব্যাংকের ১১৬ কোটি এখনো নিয়মিত দেখানো হচ্ছে।
এক্সিম ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকের একজন পরিচালকের এলাকার হওয়ায় টিপু সুলতানকে বেপরোয়া বিনিয়োগ করে ব্যাংকটি। ডাউন পেমেন্ট ছাড়া ঋণ নিয়মিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। ব্যাংকটির রাজউক এভিনিউ শাখার ঋণ তিনবারের বেশি পুনঃতফসিল করা হয়। হিসাবটিকে নিয়মিত দেখাতে নতুন করে ঋণ দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাখাটির কর্মকর্তারা জানান, প্রধান কার্যালয়ের চাপেই তারা ঋণ দিয়েছেন। ঋণটি সম্পর্কে শাখার কেউ অবহিত নন।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভোগ্যপণ্যে লোকসানের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আমাদের ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত আছে। আশা করছি নিয়মিতই থাকবে ঋণটি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়া শহরের দক্ষিণ চেলোপাড়া এলাকার বাসিন্দা পরিবহন ব্যবসায়ী টিপু সুলতান। বাড়ি বগুড়ায় হলেও থাকেন খুলনা সার্কিট হাউজের দক্ষিণ পাশের একটি ভবনে চারটি ফ্ল্যাট কিনে। ঢাকা ট্রেডিং হাউজ ও টিআর ট্রাভেলস ছাড়াও টিআর স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজেরও মালিক তিনি। তার মালিকানাধীন টিআর ট্রাভেলস লিমিটেডের বাস রয়েছে ১৬০টি। এছাড়া ট্রাক রয়েছে ৫০টির মতো।
Discussion about this post