নোটিস ছাড়াই গত ৬ এপ্রিল ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের পর্ষদ সভায় তিন শেয়ারহোল্ডার পরিচালককে অপসারণ করা হয়। যদিও ব্যাংকটির সংঘবিধির ৯১ ধারার ৩ উপধারায় তিনজন শেয়ারহোল্ডার থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে একই সভায় সংঘবিধির এ ধারা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংকটি। অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ ব্যাংকেও পাঠানো হয়েছে।
ব্যাংকটির সংঘবিধি সংশোধনের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন সভায় উপস্থিত থাকা পরিচালক আব্দুস সালাম। সিদ্ধান্ত অনুমোদন না দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একই ধরনের আবেদন করেছেন অপসারিত তিন শেয়ারহোল্ডার পরিচালকও। সব মিলিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে ব্যাংকটির পরিচালকদের মধ্যে।
তথ্যমতে, গত ৬ এপ্রিলের সভায় তিন শেয়ারহোল্ডার পরিচালককে অপসারণের পর ব্যাংকটির পর্ষদ সদস্য দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। সংঘবিধিতে উল্লিখিত ৩২ পরিচালকের স্থলে ১১ জন সদস্য রাখার অনুমোদনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চেয়েছে এনসিসি ব্যাংক। তবে পরিচালক ১১ জনে নির্দিষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই বলে বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। সর্বোচ্চ ২০ জন পরিচালক রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
এনসিসি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যানের নির্দেশে ব্যাংকটির শতাধিক কর্মকর্তাকে ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদার ৩০ জনের মতো কর্মকর্তা এরই মধ্যে ব্যাংক ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অনেককেই চাকরি খোঁজার জন্য মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। এতে ব্যাংকটিতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে এ নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি তারা। আর চেয়ারম্যানের সঙ্গে দিনভর যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
এনসিসি ব্যাংকের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, আইন অনুযায়ী ১১ জন পরিচালক করার সুযোগ নেই। তাই তাদের আবেদন নাকচ করা হয়েছে। এছাড়া পরিচালক অপসারণ ও ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। পাশাপাশি আইনি বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পরই অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩১৫তম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ৬ এপ্রিল। আগে ব্যাংকের সব পরিচালককে সভার নোটিস ও এজেন্ডা পাঠানো হলেও ওই সভার নোটিস তিন শেয়ারহোল্ডার পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে। এ তিন পরিচালক হলেন— মোহাম্মদ মইনুদ্দিন, খায়রুল আলম চাকলাদার ও হারুনুর রশীদ। ওই সভায়ই তাদের অপসারণের পাশাপাশি সংঘবিধির ৯১ ধারা সংশোধনের প্রস্তাব পাস হয়। সভায় উপস্থিত ব্যাংকের পরিচালক আব্দুস সালামসহ কয়েকজন এর বিরোধিতা করলেও কোনো ফল হয়নি। আব্দুস সালাম বিরোধিতার বিষয়টি পর্ষদ সভার কার্যপত্রে রাখার আবেদন করলেও তা রাখা হয়নি।
এ ঘটনায় গত ২২ এপ্রিল অপসারিত তিন পরিচালক পৃথকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানির রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিন পরিচালককে অপসারণের সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদন করা হয়।
ব্যাংকটির অপসারিত পরিচালক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আমরা ব্যাংকের পরিচালক কিনা বা সরিয়ে দেয়া হয়েছে কিনা, তার কিছুই জানানো হয়নি। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে আমরা চিঠি দিয়েছি। সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা, তাও খতিয়ে দেখছি।’
পরিচালকের সংখ্যা ১১তে নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়েছেন আব্দুস সালাম। গত ২৩ এপ্রিল গভর্নরের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পরিচালক ৩২ থেকে নামিয়ে ১১ জন করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত নই। সভায় এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে তা কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করা হলেও তা রাখা হয়নি।
ব্যাংকটির নবনির্মিত ভবন নিয়েও অস্বচ্ছতার অভিযোগ এনেছেন কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে তারা অভিযোগ করেন, ভবনের ব্যয়ে নানা অনিয়ম রয়েছে। এতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুন নেওয়াজের প্রতিষ্ঠান থেকে। এছাড়া ব্যাংকের সব ধরনের কার্যক্রমেও হস্তক্ষেপ করছেন তিনি। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ব্যাংকার্স সভায়ও কর্মী হয়রানি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে গভর্নর ড. আতিউর রহমান সভায় বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোরপূর্বক স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা, বরখাস্ত বা অপসারণ ও পরবর্তীতে দায়দেনা প্রাপ্তিতে জটিলতা সৃষ্টি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতি স্থগিত করার মতো নানা অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এসেছে। আমি চাই, ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের হয়রানির পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং তা প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা পিছপা হব না।’
Discussion about this post