লাকী শিপ বিল্ডার্সের কর্ণধার এস এম কাউছার। সম্পর্কে তিনি দ্য সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান রুবেল আজিজের ফুফাতো ভাই। খেলাপি হওয়ার পরও লাকী শিপ বিল্ডার্সে অর্থায়ন করেছে ব্যাংকটি। মন্দমানে খেলাপি হওয়ায় ওই ঋণের বিপরীতে ১২৭ কোটি টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে সিটি ব্যাংককে। ঝুঁকিতে রয়েছে ব্যাংকটির আরো দেড়শ কোটি টাকার অর্থায়ন।
তবে এ ঋণের ব্যাপারে অবগত নন বলে দাবি লাকী শিপ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম কাউছারের। এ ঋণের দায়ও নিতে চান না তিনি। তাই ঋণের সুবিধাভোগী কারা, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে। এ অবস্থায় ঋণ প্রস্তাব, অনুমোদন, বিতরণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিটি ব্যাংকের এমডি সোহেল আর কে হুসেইন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির পুরো নির্দেশনাই আমরা পরিপালন করব। এ ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে। যেসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, তাও দেয়া হবে। এসব প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে।’
দ্য সিটি ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এবং বণিক বার্তার নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, লাকী শিপ বিল্ডার্সের পাশাপাশি লাকী শিপইয়ার্ড, কান্ট্রি শিপ বিল্ডার্স ও লাকী ট্রেড কনসার্নেরও কর্ণধার এস এম কাউছার। শুরু থেকে তিনি সিটি ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করলেও ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় ব্যাংক। পাশাপাশি সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় ব্যাংকটি। এর পর ২০১৫ সালের ২ আগস্ট ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, ব্যাংকের কাছে তা জানতে চান এস এম কাউছার। জবাবে ১২৮ কোটি টাকা ঋণ ফেরত চেয়ে তাকে নোটিস পাঠায় সিটি ব্যাংক।
এস এম কাউছার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে বের করে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সিটি ব্যাংক। এর পর প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে লোকসানে গেল, ঋণ কেন খেলাপি হলো, আমার তা জানা নেই। পারিবারিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েও সমাধান হয়নি। আমি শিগগিরই ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি আইনি লড়াইয়ে যাব।’
জানা গেছে, প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার পর নির্মাণকাজও বন্ধ হয়ে পড়ে লাকী শিপ বিল্ডার্সের। বাড়তে থাকে ঋণের পরিমাণ। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় ১২৭ কোটি টাকা সঞ্চিতি রাখতে হয় ব্যাংকটিকে।
সূত্রমতে, এস এম কাউছার নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর প্রতিষ্ঠানটি দেখাশোনার দায়িত্ব পান সিটি ব্যাংকের ডিএমডি বাদরুদ্দুজা চৌধুরীর নেতৃত্বে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা, পারটেক্স গ্রুপের হিসাবরক্ষক আহমেদুল কবিরসহ গ্রুপের আরো কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এ অনিয়ম নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে, ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর লাকী ট্রেড কনসার্ন খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও ঋণ ও অগ্রিমের ওপর বিধিনিষেধ-সংক্রান্ত ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭ কক(৩) ধারা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটিকে ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ঋণপত্র খোলার অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেনের পরিমাণ প্রাক্কলিত বিক্রয়ের তুলনায় খুবই স্বল্প হওয়ার পরও পুনরায় প্রাক্কলিত বিক্রয়ের ভিত্তিতে ঋণসীমা ৫ কোটি ৯০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়। ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর এ ঋণ ক্ষতিজনক মানে শ্রেণীকৃত হয়ে পড়ে। এসব বিষয়ে ব্যাংকটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন অনুযায়ী, ঝুঁকি নিরূপণ না করেই অয়েল ট্যাংকার ও ফিশিং ট্রলার ক্রয়ের জন্য মেসার্স নুবাইদ ইন্টারন্যাশনাল, এসএফজি শিপিং লাইনস, এমভি জামান, সুরমা শিপিং লাইনস, সীমান্ত শিপিং লাইনস ও রেডিয়েন্স শিপিং লাইনসকে ঋণ প্রদান করে ব্যাংকটি। আবার ওইসব অয়েল ট্যাংকার ও ফিশিং ট্রলার নির্মাণ বাবদ ঋণ দেয়া হয় লাকী শিপ বিল্ডার্সকেও। একই উদ্দেশ্যে এ দ্বৈত অর্থায়নের বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে মেসার্স নুবাইদ ইন্টারন্যাশনাল ও এসএফজি শিপিং লাইনসের কর্ণধার ফরিদা ইয়াসমিন এবং এমভি জামান ও সুরমা শিপিংয়ের কর্ণধার ইফতেখারুল ইসলাম হলেও এগুলো একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ক্রেডিট মেমোয় তাদের দুজনের দাখিলকৃত পরিসম্পদ, দায় ও খরচের বিবরণী ফর্মে নিট পরিসম্পদের মূল্যমান যথাক্রমে ৩০ লাখ ও ৬ কোটি টাকা উল্লেখ থাকলেও তারা ব্যাংকে দাখিল করেছেন ৪০ কোটি ও ৮০ কোটি টাকা। আয়কর রিটার্নের সঙ্গে দাখিলকৃত পরিসম্পদ, দায় ও খরচের বিবরণী বিবেচনায় না এনে নিয়ম বহির্ভূতভাবে তাদেরকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে।
এসব ঋণ প্রস্তাব, অনুমোদন, বিতরণ ও তদারকিতে অনিয়ম/ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব নিরূপণ করে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
লাকী শিপ বিল্ডার্সের এমডি এস এম কাউছার বলেন, ‘চেয়ারম্যান তার নিজের লোকবল দিয়ে আমার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। নানা জায়গায় এ বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাইনি।’
এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান রুবেল আজিজের বক্তব্য জানার জন্য ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তা পাওয়া যায়নি।

Discussion about this post