আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সম্প্রতি ইউরোমানি ও ফিন্যান্স এশিয়ার ‘সেরা ব্যাংক’ পুরস্কার জিতেছে দ্য সিটি ব্যাংক। পুরস্কারে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিংয়ে এক ধাপ নিচে নেমে গেছে ব্যাংকটি। গত বছর শেষে ব্যাংকটির রেটিং এক ধাপ কমে ২ (সন্তোষজনক) থেকে ৩-এ (মোটামুটি ভালো) নেমে এসেছে।
ছয় মাস অন্তর ক্যামেলস রেটিং করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, উপার্জনক্ষমতা, তারল্য ও বাজার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এ রেটিং করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সার্বিক অবস্থা এতে প্রতিফলিত হয়।
আর্থিক অবস্থার অবনতি ও অনিয়মের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিংয়ে অবনতি হয়েছে দ্য সিটি ব্যাংকের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ব্যাংকটির শ্যামলী শাখায় অনিয়ম বেরিয়ে এসেছে। ওই শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা প্রায়ই দিনের কার্যক্রম শুরুর পর ব্যাংকের অর্থ কিছু ব্যবসায়ীকে ঘণ্টাভিত্তিক হিসেবে ঋণ দিতেন। আবার দিনের কার্যক্রম বন্ধের আগেই তা হিসাবে দেখাতেন। যদিও ব্যাংকের ঘণ্টা ভিত্তিতে ঋণ দেয়া এবং এ থেকে সুদ আদায়— এসবের কোনো দালিলিক প্রমাণ রাখা হতো না। এমনকি সিসিটিভিও বন্ধ রাখা হতো এ সময়। আর ওই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত সুদের অর্থ ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের সহায়তায় ভাগাভাগি করে নিতেন জড়িত কর্মকর্তারা। এভাবে পকেট ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন শাখার কর্মকর্তারা। এ ঘটনা বেরিয়ে এলে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দ্য সিটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও এর সত্যতা মেলে। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অকাট্য দালিলিক প্রমাণ না পাওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মনজুরুল আলমসহ শাখার চার কর্মকর্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এর মধ্যে মনজুরুল আলম বর্তমানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে কর্মরত, বাকিরা অন্যত্র।
এদিকে ঋণ নীতিমালায় ছাড়ের পরও ২০১৩ সালের জুনে ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণ ছিল ৬৬২ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণ দাঁড়ায় ৭০৬ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ফলে ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়। এতে গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির সামগ্রিক ক্যামেলস রেটিং নেমে আসে ৩ বা মোটামুটি ভালোয়। গত বছরের জুন শেষে এ রেটিং ছিল ২ বা সন্তোষজনক। এদিকে চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণ ৫৯৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এরই মধ্যে ব্যাংটির ক্রেডিট কার্ডের জালিয়াতির ঘটনাও ধরা পড়েছে।
জানতে চাইলে ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনুদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ডিসেম্বরে ঋণ আদায় করতে না পারায় সূচকে অবনতি হয়েছিল। তবে বর্তমানে এ অবস্থা নেই। জুন শেষে ব্যাংকটির পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। শ্যামলী শাখার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অকাট্য দালিলিক প্রমাণ না পাওয়ায় কঠোর শাস্তি দেয়া সম্ভব হয়নি। তাদের পদত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছে।
এদিকে অধোগতিতে থাকা এ ব্যাংকটিকে নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বৈঠকে তাদের দ্রুত আর্থিক অবস্থার উন্নতি করার পাশাপাশি সব ধরনের অনিয়ম বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মো. রাজী হাসান, নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী, অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম, দ্য সিটি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনুদ্দিনসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই বৈঠকে নির্দেশনা দেয়া হয়, নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী শেয়ারবাজারের অতিরিক্ত বিনিয়োগ দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। শ্যামলী শাখার মতো জালিয়াতি এড়াতে তদারকি জোরদার করতে হবে। কোর রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সন্তোষজনক মানে উন্নীত করতে হবে। ক্রেডিট কার্ডে জালিয়াতি রোধে তদারকি বাড়াতে হবে। অফ ব্যালান্সশিট আইটেম কমিয়ে আনতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আবু হেনা মো. রাজী হাসান বলেন, আর্থিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সিটি ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ সভা হয়েছে। আর্থিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি সব ধরনের অনিয়ম বন্ধ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
Discussion about this post