দেশে সরকারি-বেসরকারি খাতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে বিদেশী ঋণ। গত চার বছরে এ ঋণ বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। চীন, জাপান ও ভারতের কাছ থেকে বড় ধরনের প্রস্তাব থাকায় আগামীতে এ ঋণ আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উদার বিদেশী ঋণ নীতিমালার কারণে এ ঋণ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের স্বল্প মেয়াদে কঠিন শর্তে ঋণও। আর বিদেশী ঋণের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় রাষ্ট্রের দায় বাড়ছে। এতে তৈরি হচ্ছে আর্থিক ঝুঁকি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১১ সালের শুরুতে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলে বিদেশী ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৯৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০১৪ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৪০ লাখ ডলারে।
তবে আগামী পাঁচ বছরে এ ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ গত বছর জাপান ৬০০ কোটি ডলার ঋণসহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও ২০০ কোটি ডলার ক্রেডিট লাইনের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ঋণ প্রস্তাব প্রতি বছরই বাড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) নিয়মিত ঋণ।
অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে ব্যাংকের সুদহার বেশি থাকায় বিদেশ থেকে ব্যক্তিখাত বেশি ঋণ নিচ্ছে। তবে যাদের রফতানি আয় রয়েছে, তারাই কেবল এ ঋণ নিচ্ছে। তাই এক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেই।
সরকারি ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সরকারি খাতে বিদেশী ঋণ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে কম। জিডিপির অনুপাতে সরকারি ঋণ ৪০ শতাংশের নিচে। তাই বিদেশী ঋণ নিয়ে সরকার কোনো ঝুঁকিতে নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশী ঋণ কম সুদে পাওয়া গেলেও অনেক বেশি শর্ত থাকে এতে। তাছাড়া এর পরামর্শক ব্যয়ও অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোট ঋণের ১০-১৫ শতাংশ ব্যয় করতে হয় পরামর্শকদের পেছনে। পাশাপাশি এ ঋণের অপচয়ও হয় বেশি। তাই এ ঋণ মোটেই সাশ্রয়ী নয়। বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়লে বিদেশীরা দ্রুত এ ঋণ তুলে নিতে চাইবে। তখন সমস্যায় পড়বে দেশ। তবে বিদেশী ঋণ দীর্ঘমেয়াদি হলে তাতে সমস্যা হবে না বলেই মনে করছেন তারা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা মিশনের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণে সুদ কম হওয়ায় অর্থনীতির জন্য কোনো ঝুঁকি নেই। তবে এ ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে ঝুঁকি থেকে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালের শুরুতে সরকারের মোট বিদেশী ঋণ ছিল ২ হাজার ১৯০ কোটি ডলার। ২০১২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৯৪ কোটি, ২০১৩ সালে ২ হাজার ৭৭৩ কোটি ও ২০১৪ সালে ২ হাজার ৯৮২ কোটি ডলার।
এছাড়া বেসরকারি খাতে ২০১১ সালের শুরুতে বিদেশী ঋণ ছিল ১১০ কোটি ডলার। ২০১২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৯ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয় ৪০৬ কোটি ডলার। ২০১৪ সালের শেষে এ ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮৯ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ২০১১ সালে সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ ছিল ২ হাজার ২৯৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ২০১২ সালে ২ হাজার ৭৭৩ কোটি ৮০ লাখ, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ১৭৯ কোটি ২০ লাখ ও ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠিন শর্তে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় কঠিন শর্তের ঋণে লুক্কায়িত অনেক শর্ত থাকে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ঋণের সঠিক ব্যবহার না করে কেবল ঋণ বাড়ালে রাষ্ট্রের দায় বাড়বে। আপাতত এ ঋণ অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব না ফেললেও ভবিষ্যতে তা ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
জানা গেছে, নব্বইয়ের দশক থেকে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যবসায়ীরা বিদেশী ঋণ নিচ্ছেন। ১৯৯৯ সালে তত্কালীন অর্থ সচিব ড. আকবর আলি খান বাছাই কমিটির মাধ্যমে অনুমোদন ও তদারকির প্রস্তাব দিলে তা অনুমোদন করা হয়। এ সময় গভর্নরকে প্রধান করে বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ অনুমোদন কমিটি গঠন করা হয়, যাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিনিয়োগ বোর্ড ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়। এর পর থেকেই এ কমিটির মাধ্যমে বিদেশী ঋণ অনুমোদন হয়ে আসছে।
বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ কমিটি বেসরকারি খাতে ৬১৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪৭ কোটি, ২০১০ সালে ৩০ কোটি, ২০১১ সালে ৯০ কোটি, ২০১২ সালে ১৪৬ কোটি, ২০১৩ সালে ১১৭ কোটি ও ২০১৪ সালে ১৮৩ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়।
Discussion about this post