রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এ অবস্থায় টাকার বিপরীতে মান হারাচ্ছে ডলার, বেসরকারি ব্যাংকগুলোও আগ্রহ হারাচ্ছে ডলার মজুদে। এতে আমদানিকারকরা লাভবান হলেও বিপাকে রফতানিকারকরা। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের এ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে রফতানি আয় কমার পাশাপাশি বৈধ পথে রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম কমছে। ৯ ডিসেম্বর আন্তঃব্যাংক ডলারের মূল্য ছিল ৮১ টাকা। ১০ ডিসেম্বর তা ৮০ টাকা ৯৫ পয়সা, ১১ ডিসেম্বর ৮০ টাকা ৮০, ১২ ডিসেম্বর ৮০ টাকা ৬৫ ও ১৩ ডিসেম্বর ৮০ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়ায়। ব্যাংকারদের আশঙ্কা, আগামী সপ্তাহে ডলারের দাম আরও পড়তে পারে। ফলে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, সম্প্রতি মূলধনি যন্ত্রপাতি, খাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের আমদানি কমেছে। সরকারি ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল ছাড়া বড় ধরনের কোনো আমদানি নেই। তবে রেমিট্যান্স ও রফতানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা উল্লম্ফিত হওয়ায় ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কিছু বিদেশী ঋণ অনুমোদন দেয়ায় ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা না থাকায় ব্যাংকিং খাতে (যারা বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করেন) অস্থিরতা বেড়েছে। তার ওপর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেশি দামে ডলার কিনে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তুলছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (এবিবি) সভাপতি ও এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে ডলারের দাম নিম্নগামী। লোকসানের আশঙ্কায় আমরা ডলার ছেড়ে দিচ্ছি। আবার দাম নিম্নগামী থাকলে রফতানি ও রেমিট্যান্স আয় কমবে, এটাও ব্যাংকগুলোর জন্য শঙ্কার জায়গা। এতে রফতানিকারকরা বিপাকে পড়লেও আমদানিকারকরা লাভবান হচ্ছেন।’
আমদানি ব্যয় কতটা কমেছে, তা উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে। দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে পণ্য আমদানি ব্যয় ছিল ২৮৩ কোটি ৫১ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৯৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পণ্য আমদানি ব্যয় ২৯৭ কোটি ডলার হলেও গত বছরের একই সময় ছিল ৩২৯ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এ বছরের অক্টোবরে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৬৩ কোটি ৯১ লাখ, যা ২০১১ সালের একই সময়ে ছিল ২৯৭ কোটি ৭১ লাখ ডলার। এ হিসাবে শুধু অক্টোবরেই পণ্য আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে পণ্য আমদানির জন্য ১ হাজার ১৫২ কোটি ৫১ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩০২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। পণ্য আমদানি বাবদ নতুন ঋণপত্র খোলার হার কমেছে গড়ে সাড়ে ১১ শতাংশ। একইভাবে ঋণপত্র নিষ্পত্তিজনিত ব্যয়ও কমেছে ১১ শতাংশ হারে।
সিঅ্যান্ডএফ হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে পণ্য আমদানি বাবদ ১ হাজার ৯৭ কোটি ১৪ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। আর ২০১১-১২ অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ১৭৬ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ার এটাই বড় কারণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, বর্তমানে সরবরাহ ভালো হলেও চাহিদা কম। অতিরিক্ত ডলার জমা হওয়ায় সবাই তা বিক্রি করতে চাচ্ছে। ফলে দাম নিম্নগামী। আমদানি না বাড়লে ডলারের দাম আরও পড়বে। এটা সত্যিই একসময় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ডলারের দাম কমতে থাকায় বিপাকে পড়েছেন রফতানিকারকরা। এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘দেশীয় রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, উচ্চ সুদ হারের পাশাপাশি এ খাতটি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। এমন অবস্থায় ডলারের দাম কমে গেলে এ চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, আমদানি চাহিদা কমা সত্ত্বেও ডলারের দাম কীভাবে স্থিতিশীল রাখা যায় তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেখা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জানা গেছে, দেশের ৪৭টি ব্যাংক মিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার ধারণ করার সীমা নির্ধারিত আছে। বর্তমানে এ সীমা ৮১০ মিলিয়ন ডলার। ব্যাংকগুলো এ সীমা অতিক্রম করলে ডলার কিনে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি ডলার ধারণ নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলেও তা বিক্রির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছে। দাম কমার ফলেই ডলার ধরে রাখতে চাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনা অব্যাহত রাখলেও গত মঙ্গলবার থেকে তা কিনছে নগদ টাকার পরিবর্তে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, বছর শেষে ঋণপত্র খোলা বা ডলারের চাহিদা কিছুটা কমে যায়। এটা আবার আগামী বছরের জানুয়ারির শেষ দিক থেকে বাড়বে। ডলারের দাম কিছুটা পড়তে থাকায় ব্যাংকগুলো ডলার ছেড়ে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু নগদ অর্থ দিয়ে ডলার কিনলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাবে, এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেশি দামে ডলার কিনে মুদ্রাবাজার আরও অস্থির করে তুলেছে। এসব ব্যাংক বেশি দামে ডলার কিনে আবার বেশি দামে সরকারি ঋণপত্র নিষ্পত্তি করছে। ফলে আমদানিতে সরকারের ব্যয় হচ্ছে বেশি। সম্প্রতি এবিবি ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদার) সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে এ প্রবণতা বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়।
বেশি দামে ডলার কেনার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ব্যাংকের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার চেষ্টা সত্ত্বেও ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, ৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ঋণপত্র নিষ্পত্তি করে ৮১ টাকা ৯০ পয়সায়, সেদিন আইএফআইসি ব্যাংক তা করে ৮১ টাকা ৫০ পয়সায়। ১০, ১১ ও ১২ ডিসেম্বর অগ্রণী ব্যাংক একই দরে ঋণপত্র নিষ্পত্তি করলেও আইএফআইসি ব্যাংক তা করে যথাক্রমে ৮১ টাকা ৫০ পয়সা, ৮১ টাকা ৩০ পয়সা ও ৮১ টাকা ২০ পয়সায়।
Discussion about this post