বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেয়নি। তার পরও প্রধান কার্যালয়ের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড। কারওয়ান বাজার মোড়ে ভবনটি নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোরিয়ান হেরিম আর্কিটেক্ট অ্যান্ড প্ল্যানার্স কোম্পানিকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা পরিশোধও করেছে ব্যাংকটি।
ভবনটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯৫ কোটি টাকা। এরই মধ্যে বেজমেন্টের তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণাধীন এ ভবনের গর্তেই বুধবার ধসে পড়ে বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়কের কিছু অংশ। ফাটল দেখা দেয়ায় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে পাশের সুন্দরবন হোটেল।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, যে কোনো স্থাপনা নির্মাণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। প্রধান কার্যালয় নির্মাণে ন্যাশনাল ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা অনুমোদন হয়নি। তার পরও ব্যাংকটি প্রধান কার্যালয়ের নির্মাণকাজ চালু রাখায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ন্যাশনাল ব্যাংককে প্রধান কার্যালয় নির্মাণের জন্য এখনো অনুমোদন দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ চালালে এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের। এক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয় পরিশোধের জন্য বিদেশে অর্থ প্রেরণের অনুমতি দেয়া হবে না।’
সূত্রমতে, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে হোটেল সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় ১৯৯৪ সালে দুই দফায় ও ১৯৯৯ সালে এক দফায় মোট ৬৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ জমি কেনে ন্যাশনাল ব্যাংক। একই দাগে জমি কেনে প্রগতি ইন্স্যুরেন্সও। এতে জমির ব্যবহার আটকে থাকে। পরে ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বণ্টননামা দলিল সূত্রে ন্যাশনাল ব্যাংক ৫৯ দশমিক ৯২ কাঠা জমি পায়। তার আগেই ২০০৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ওই জমিতে ২০ তলাবিশিষ্ট প্রধান কার্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান হেরিম আর্কিটেক্ট অ্যান্ড প্ল্যানার্সের সঙ্গে চুক্তি করে ব্যাংকটি। তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ১৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণের অনুমতি না দেয়ায় ১৫ তলা নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। পরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বেবিচকের নিয়মানুযায়ী প্রধান কার্যালয়ের জন্য ১২ তলা ভবন ও ১২ তলা আবাসিক হোটেল নির্মাণের অনুমতি দেয়।
ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংকের হোটেল ব্যবসার সুযোগ না থাকলেও ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের অফ সাইট সুপারভিশন বিভাগ ন্যাশনাল ব্যাংককে চুক্তি অনুযায়ী হেরিম আর্কিটেক্ট অ্যান্ড প্ল্যানার্স কোম্পানিকে অর্থ প্রেরণের অনুমতি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটি প্রায় ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে। কী কাজের জন্য এ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা জানতে চেয়ে চিঠি দিলেও উত্তর মেলেনি।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, হোটেল ব্যবসার সুযোগ না থাকায় ব্যাংকটির কাছে ২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রধান কার্যালয়ের জন্য দুটি ভবন আবশ্যক হবে না বিধায় আবাসিক হোটেলের জন্য নির্ধারিত জমি বিক্রির পরামর্শ দেয়া হয়। তবে এখনো তা পরিপালন করেনি ব্যাংকটি।
পরে গত বছরের ১৭ জুলাই ব্যাংকটিকে নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে বলা হয়, প্রধান কার্যালয়ের জন্য দুটি ভবনের প্রয়োজন পড়বে না। তাই প্রধান কার্যালয়ের জন্য কী পরিমাণ জমি প্রয়োজন, তা নির্ধারণের পর নতুন করে নকশা প্রণয়ন করতে বলা হয়। কোরিয়ান কোম্পানিকে কী খাতে অর্থ পাঠানো হয়েছে, জানতে চাওয়া হয় তাও। পাশাপাশি প্রধান কার্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য স্পেস নির্ধারণ এবং নকশা ও ডিজাইন সংশোধনের পর গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে ব্যয় নির্ধারণ করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির নির্দেশ দেয়া হয়। তবে ব্যাংকটি এসব নির্দেশনা পালন না করেই ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শামসুল হুদা খান বলেন, ‘আমরা প্রথমে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি একটি হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলাম। তবে ব্যাংকের কার্যালয় ভাড়া দেয়া বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় সে পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছি। বর্তমানে যে নির্মাণকাজ চলছে, তাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন রয়েছে। আমার আগের এমডি দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই এ অনুমোদন হয়েছে।’
কোরিয়ান কোম্পানি হেরিম আর্কিটেক্ট অ্যান্ড প্ল্যানার্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডোঙ্গা কনস্ট্রাকশনের পক্ষে স্থানীয় ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে এমএস কনস্ট্রাকশন, মাম ইনটেক্স ও বিডি কনস্ট্রাকশন।
যোগাযোগ করা হলে এমএস কনস্ট্রাকশনের অন্যতম কর্ণধার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, বেজমেন্টের তিন তলার বড় অংশই নির্মাণ শেষ হয়েছে। এক পাশে ধসে যাওয়ায় নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে। এখানে দুটি ১২ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ডিজিএমের নামে মামলা: নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের গর্তে রাস্তা ধসে পড়ার ঘটনায় ন্যাশনাল ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিজিএম) নাজিবুদ্দিন ভুঁইয়াসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজউকের পক্ষে সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তা (অথরাইজড কর্মকর্তা, রাজউক) এ জেড এম শফিউল হান্নান বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় মামলাটি করেন (মামলা নম্বর- ১৫)।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন— এমএস কন্সট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম সালাউদ্দিন আহমেদ ও প্রকল্প পরিচালক আকতারুল আলম। এছাড়া নির্মাণকাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল জানান, বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণকাজ না করায় নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।
Discussion about this post