হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারির পর নতুন করে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ক্রমেই অবনতি ঘটছে ব্যাংকিং খাতের। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৩ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত তিন মাসেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বেড়েছে ৪ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। ফলে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বিতরণ করা ঋণের ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও বেসিক এবং বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ও ইসলামী ব্যাংকের।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় জালিয়াতির কারণেই খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকে জমি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগ করেছেন। তারা সবাই এখন আটকে গেছেন। দেশের নামি অনেক প্রতিষ্ঠানও এভাবে আটকে গেছে। এসব কারণেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এ ধারা আরো কিছুদিন চলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ৫৬ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। জুন শেষে বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৪ কোটি ৩৯ হাজার ২১২ কোটি টাকা। সে সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা বা বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। অর্থাত্ নয় মাসে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৩ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ঋণ এসএমএ (বিশেষ উল্লেখ) থেকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গেলেই তা খেলাপিতে চলে যাচ্ছে। এ কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। গ্রহীতারাও তাই ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠিন ঋণ নীতিমালার কারণেই খেলাপি বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে ঋণের মানের কোনো সম্পর্ক নেই।
ব্যাংকিং খাতে ঋণ শ্রেণীকরণের তিনটি পর্যায় রয়েছে। তা হলো— নিম্নমান, সন্দেহজনক ও মন্দ বা ক্ষতি। গত বছরের জুনের মাঝামাঝি এক প্রজ্ঞাপনে এ তিন ক্ষেত্রেই তিন মাস করে সময় কমিয়ে আনা হয়। ডিসেম্বর থেকে এ নীতিমালা কার্যকর হয়েছে। এতে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে নিম্নমান, ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে হলে সন্দেহজনক ও নয় মাসের বেশি হলে তাকে মন্দ বা ক্ষতি মানে বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন এ নীতিমালায় তিন মাসের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ শ্রেণীকৃত হিসেবে বিবেচিত হলেও তা খেলাপি নয়। কেননা ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণ ছয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তাকেই কেবল খেলাপি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি হিসাবে নিম্নমানও যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে ৮৪ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ২৪ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। অর্থাত্ বিতরণ করা ঋণের ২৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। জুনে এ হার ছিল ২৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বা ২৩ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে খেলাপি ছিল ২১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
সেপ্টেম্বর হিসাবে, বেসরকারি খাতের ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৫ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ২২ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের সাড়ে ৭ শতাংশ। জুনে খেলাপি ছিল ১৯ হাজার ৬১১ কোটি বা ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৩৪ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
একই সময়ে বিদেশী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা, তাদের বিতরণ করা ঋণের যা ৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। ডিসেম্বরে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বা ৮৪৫ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকের খেলাপি হয়েছে ৮ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা ২৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে এ হার ছিল ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ বা ৭ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ সোনালী ব্যাংকের। সেপ্টেম্বর হিসাবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা সাড়ে ৪২ শতাংশ। জুন শেষে এর হার ছিল কিছুটা কম অর্থাত্ ৩৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আর ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৪৫ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা ৩৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
একই সময়ে অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ১১৯ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা ২৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ২২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর ডিসেম্বরে ছিল ২৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ বা ৪ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। এছাড়া জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের ১৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ অর্থাত্ ৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ২৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরের হিসাবে, বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। জুনে ছিল ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ বা ৫৪৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ বা ১ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রীয় খাতের বিশেষায়িত ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল জুনভিত্তিক হিসাবে ১ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৮৮ ও ডিসেম্বরে সাড়ে ৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ীরা খেলাপি হয়ে পড়ছেন। সব ব্যাংকই তাদের ঋণ দিয়েছে। এ কারণে খেলাপিও বাড়ছে। এছাড়া নতুন ঋণ নীতিমালা তো রয়েছেই। তবে নতুন ঋণ নীতিমালা ঠিক রেখেই ব্যবসায়ীদের সঠিক পথে আনতে হবে। নীতিমালা কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না।
Discussion about this post