বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স আহরণ এবং বিদেশী মুদ্রায় ইস্যুকৃত বন্ডের বাজার সম্প্রসারণ— এসব শর্তেই মূলত এনআরবি ব্যাংকগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়। এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরুর এক বছর পারও করেছে তারা। কিন্তু এসব উদ্দেশ্যের কোনোটিই প্রত্যাশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে প্রবাসীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত তিন ব্যাংক।
যদিও এনআরবি ব্যাংকগুলো বলছে, বিভিন্ন অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণে বাংলাদেশের ব্যাংক সম্পর্কে বিদেশী ব্যাংকগুলোর নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। এ কারণে সহজেই এনআরবি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছে না তারা। ফলে লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারছে না এনআরবি ব্যাংকগুলো। টিকে থাকার প্রয়োজনে তাই প্রচলিত সেবার বাইরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের। তবে প্রত্যাশিত ব্যবসা শুরুর সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
নতুন অনুমোদন পাওয়া নয়টি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি এনআরবি। প্রবাসীদের উদ্যোগে গঠিত ব্যাংক তিনটি হলো— এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল ও এনআরবি ব্যাংক। ৩০টি শর্ত দিয়ে আগ্রহপত্র প্রদান করা হয় তাদের। বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স আহরণে ভূমিকা রাখার শর্তসাপেক্ষে লাইসেন্স পায় ব্যাংক তিনটি। ২০১৩ সালের প্রথম প্রান্তিকের পর ধাপে ধাপে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে তারা। যদিও এসব শর্ত প্রতিপালন করতে পারেনি ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, এনআরবি ব্যাংকগুলোকে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল বৈদেশিক বাণিজ্যে ভূমিকা রাখার শর্তে। কিন্তু তারা স্থানীয় ব্যবসায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। শিগগিরই তাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হবে।
জানা গেছে, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে বিদেশী ব্যাংকের সঙ্গে হিসাব খুলেছে। তবে এসব হিসাবে লেনদেনের কোনো সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে কোনো ধরনের আমদানি-রফতানি ব্যবসাও শুরু করতে পারেনি ব্যাংকটি। তবে রেমিট্যান্সের জন্য ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। মানিগ্রামের সঙ্গেও চুক্তির চেষ্টা করছে ব্যাংকটি।
২০টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া সর্বশেষ হিসাবে, ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ ও ৮৯১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। তবে প্রবাসীদের কোনো অংশগ্রহণ নেই এতে।
জানতে চাইলে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেওয়ান মুজিবুর রহমান বলেন, ‘নতুন ব্যাংক হওয়ায় বিদেশী ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সহজেই ব্যবসা করা যাচ্ছে না। আমরা হিসাব খুলতে পারলেও ক্রেডিট লাইন ঠিক হয়নি। ফলে বৈদেশিক ব্যবসাও শুরু করা যায়নি। তবে রেমিট্যান্সের জন্য ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।’
এদিকে বিদেশী ব্যাংকের সঙ্গে হিসাব খোলার চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের বাইরে এখনো আসতে পারেনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। যদিও ১০টি শাখার মাধ্যমে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এনআরবি গ্লোবাল। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটি আমানত সংগ্রহ করেছে ৪৩০ কোটি টাকা। আর ঋণ বিতরণ করেছে ৪৮২ কোটি টাকা।
এনআরবি গ্লোবালের এমডি মো. আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা কয়েক মাস ধরে বিদেশী মুদ্রায় দেশের বাইরের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে হিসাব খোলার চেষ্টা করেও পারিনি। এসব কারণে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অবদান রাখা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে আমাদের শতভাগ চেষ্টা আছে এসব ব্যবসায় ভূমিকা রাখার।’
একই ধরনের সমস্যায় ভুগছে প্রবাসীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আরেক ব্যাংক এনআরবি। বৈদেশিক কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারেনি তারাও। এ পর্যন্ত আটটি শাখা চালু করেছে ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া সর্বশেষ হিসাব বলছে, ৪৬১ কোটি টাকা আমানত ও ২৩৯ কোটি ঋণ বিতরণ করেছে এনআরবি ব্যাংক।
এ বিষয়ে ব্যাংকটির এমডি মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনআরবি ব্যাংকের ধারণাটাই ভিন্ন। অথচ তারা পুরোপুরি প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের এমন কোনো সেবা নেই, যা দিয়ে অন্যদের থেকে তাদের আলাদা করা যায়।
ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘যে উদ্দেশ্যে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, এনআরবি ব্যাংকগুলো তা পূরণ করতে পারছে না। তবে আশা করছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক তিনটি প্রচলিত ব্যবসা থেকে বের হয়ে সেদিকেই গুরুত্ব দেবে।’
Discussion about this post