বাংলাদেশ থেকে ১০ কোটি ডলার ফিলিপাইনের আর্থিক খাতে প্রবেশ করেছে। ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ অর্থের এ অবৈধ প্রবেশ তদন্ত করে দেখছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম ইনকোয়ারার।
ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এ অর্থ জমা হয় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনে (আরসিবিসি)। প্রবাসী ফিলিপিনোদের রেমিট্যান্স স্থানান্তরকারী সংস্থা ফিলরেমের মাধ্যমে এ অর্থ ব্যাংকের মাকাতি সিটি শাখায় জমা হয়। ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপক এ কাজ করেন। পাঁচটি পৃথক হিসাবে মোট ১০ কোটি ডলারের (৭৮০ কোটি টাকা) সমপরিমাণ অর্থ সেখানে জমা করা হয়। এর পর স্থানীয় মুদ্রা পেসোয় রূপান্তর করে পুরো অর্থ একটি করপোরেট হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। করপোরেট ব্যাংক হিসাবটি চীনা বংশোদ্ভূত একজন ফিলিপিনো ব্যবসায়ীর। ওই ব্যবসায়ীর হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর হয় তিনটি স্থানীয় ক্যাসিনোয়। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে। আর ফিলিপাইনের ইতিহাসে অর্থ পাচারের বৃহত্তম ঘটনা এটা। ফিলিপাইনের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি দেশটির অর্থ পাচার প্রতিরোধ কাউন্সিল (এএমএলসি) বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক ও অপারেশনাল হেড দেবপ্রসাদ দেবনাথ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরাও বিষয়টি জেনেছি। তবে আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য এখনো আসেনি। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত চলছে, শেষ হলেই প্রকৃত তথ্য জানা যাবে।’
আরসিবিসির এক কর্মকর্তা ফিলিপাইনের তদন্তকারীদের জানান, সন্দেহজনক লেনদেন সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর পরই এএমএলসিকে তা জানানো হয়। একই সঙ্গে জানানো হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও। পাশাপাশি ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও এ সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
অবগত হওয়ার পরই এ নিয়ে তদন্তে নামে এএমএলসি। সে সময় সংস্থাটি বড় অঙ্কের এ অর্থ পাচার ও এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসতে পারে বলে জানায়। এ লক্ষ্যে এএমএলসি ইনকোয়ারারকে এ-বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কয়েক দিন সময় দেয়ার অনুরোধ জানায়। এতে সম্মতি জানায় ইনকোয়ারার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, তহবিলটি ম্যাকাওভিত্তিক একজন প্রমোদ আয়োজকের। এসব তহবিল সোলেয়ার রিসোর্ট ও ক্যাসিনো, ম্যানিলার সিটি অব ড্রিমস ক্যাসিনো এবং মাইডাস হোটেল ও ক্যাসিনোর বকেয়া পরিশোধে ব্যবহার হয়। তবে অন্য একটি সূত্র বলেছে, উপরোক্ত তিনটি ক্যাসিনো থেকে কালোবাজারে অন্য মুদ্রায় রূপান্তরের পর তহবিলটি আবারো ফিলিপাইনের বাইরের ব্যাংক হিসাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিস: ২০০৪-১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, শুধু ২০১৩ সালেই অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে ৯৬৬ কোটি ডলারের বেশি। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১২ সালে পাচার হয়েছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। আর গত ১০ বছরে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া এসব অর্থের উল্লেখযোগ্য গন্তব্য হলো— সিঙ্গাপুর, দুবাই, হংকং, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশ।
জিএফআইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৪-১৩ সালে প্রতি বছর গড়ে ৫৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে। আলোচ্য ১০ বছরের মধ্যে অবৈধ অর্থপ্রবাহ সবচেয়ে বেশি ছিল ২০১৩ সালে। এছাড়া ২০১২, ২০০৮ ও ২০০৯ সালেও উল্লেখযোগ্য অর্থ অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে গেছে। এ তিন বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় যথাক্রমে ৭২২ কোটি ৫০ লাখ, ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ও ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে এ অর্থ স্থানান্তর করা হয়।
জিএফআইয়ের হিসাবে, আলোচ্য এক দশকে মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪ হাজার ৯১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এ সময় গড়ে প্রতি বছরে পাচার হয়েছে ৪৯১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। মূলত রফতানির ক্ষেত্রে এ মিস ইনভয়েসিং হয়।
অন্যদিকে ওই ১০ বছরে হট মানি আউটফ্লো বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৬৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এ প্রক্রিয়ায় পাচার হয় প্রতি বছর গড়ে ৬৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে, যার পরিমাণ ১৩১ কোটি ১০ লাখ ডলার।
Discussion about this post