এবি, আল-আরাফাহ্ ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের টেকনাফ ও কক্সবাজার শাখায় হিসাব খুলে অর্থ সংগ্রহ করেছে মানব পাচারকারীরা। দেশের প্রায় ১০টি জেলা থেকে এসব হিসাবে নিয়মিত অর্থ জমা হয়েছে; উত্তোলনও হয়েছে নিয়মিত ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিশেষ পরিদর্শনে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিএফআইইউ। তবে এসব হিসাবের লেনদেন এখনো চালু আছে বলে জানা গেছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব জেলার মানুষ নিয়মিত পাচারের শিকার, সেখান থেকে এবি ব্যাংকের টেকনাফ শাখায় ফরিদ আহমেদ, গনু মিয়া, নুরুল আলম ও ফারুক আহমেদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা হয়েছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকের কক্সবাজার শাখায় মিনুয়ারা বেগম, টেকনাফ শাখায় সিদ্দিক আহমেদ ও নূর মোহাম্মদের ব্যাংক হিসাবেও একইভাবে অর্থ জমা ও উত্তোলন হয়েছে। আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের টেকনাফ শাখায় মেসার্স সৈয়দ টেলিকমের হিসাবে একইভাবে অর্থ জমা ও উত্তোলন হয়েছে। সৈয়দ টেলিকমের মালিক শাহপরীর দ্বীপের আবু সৈয়দ। তিনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হিসাবে এ অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাকিরা নিজেদের হিসাবেই অর্থ নিয়েছেন।
জানতে চাইলে এবি ব্যাংকের টেকনাফ শাখার ব্যবস্থাপক নুরুল হুসাইন বলেন, এসব হিসাবে জমা ও উত্তোলন অস্বাভাবিক হওয়ায় আমরা সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন দিয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে। তবে এসব হিসাব এখনো চলমান।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাজধানী ও এর আশপাশ, নরসিংদী, ঝিনাইদহ, যশোর, মাদারীপুর, কুষ্টিয়া, মাধবদী, পুরান ঢাকা, গাজীপুরের বিভিন্ন ব্যাংক শাখা থেকে নিয়মিত এসব হিসাবে অর্থ জমা হয়েছে। প্রতিবার জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ১-৪ লাখ টাকার মধ্যে। তবে এসব হিসাব থেকে নিয়মিত অর্থ তুলে নেয়া হয়েছে। যারা এসব হিসাবে অর্থ জমা করেছেন এবং পাচারের শিকার হয়েছেন, তারা একই পরিবারের।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এসব হিসাবধারীকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দুদকও শিগগিরই এ নিয়ে কাজ শুরু করবে বলে জানা গেছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ কার্যক্রম আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে। আগের মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথের মেয়াদকালীন দুদক ও সিআইডির কাছে ৩২টি বিশ্লেষণ প্রতিবেদন পাঠায় বিএফআইইউ। তবে গত কয়েক মাসেই ৬০টি বিশ্লেষণ প্রতিবেদন দিয়েছে বিএফআইইউ। এর মধ্যে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে পুলিশ ও দুদকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেও তদন্ত করছে বিএফআইইউ।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবাসী আয়ের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন সপ্তম। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৯০ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মী বৈধভাবে বিদেশে গেছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে বিদেশ গমনের ঘটনা বেড়েছে। গত বছর ডিসেম্বরে প্রকাশিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে বঙ্গোপসাগর দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছেন ৫৩ হাজার বাংলাদেশী। আর ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে প্রায় তিন বছরে সাগরপথে পাচার হওয়া মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার।
অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং জনশক্তি রফতানিকারকরা বলছেন, অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। এজন্য তারা সরকারিভাবে জনশক্তি রফতানির ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন।
অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া বন্ধ করতে ২০১৩ সালে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন হয়েছে। ২০১২ সালে হয় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন। এসব আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু। কিন্তু কঠোর আইন, জীবনের ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা কোনো কিছুই অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া বন্ধ করতে পারছে না। বরং আরো বেড়েছে।
Discussion about this post