শুধু আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে, এমন এজেন্টের সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়েছে। প্রতিটি এজেন্টের বিপরীতে একজন করে হিসাব করলেও এ পর্যন্ত চার লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এর মাধ্যমে।
বাংলাদেশে দ্রুত ক্রমবর্ধমান এ সেবার চিত্র এরই মধ্যে সারা বিশ্বে মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছে, যেখানে বড় ভূমিকা রেখেছে মোবাইল ব্যাংকিং। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস নিয়ে গত আগস্টে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্স। এ প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিস্তৃতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও জিএসএমএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৪ হাজার ১৭০। ২০১২ সালের মার্চে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৯৩। এসব এজেন্ট পরিচালনা করতে প্রায় ১৫ হাজার পরিবেশকও (ডিস্ট্রিবিউটর) রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, প্রতিটি লেনদেনে দুটি এজেন্ট কাজ করছে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, যা এরই মধ্যে চার লাখ ছাড়িয়েছে। এছাড়া এ সেবা খাতে পরিবেশকসহ আরো বহু শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থানও হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে মোবাইল ব্যাংকিং।
রাজধানীর রামপুরার স্বল্প শিক্ষিত তরুণ মো. আবদুল্লাহ। চাকরির জন্য কয়েক বছর বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করলেও সাক্ষাত্কারের জন্য ডাক পাননি। পরে এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টের লাইসেন্স নেন। বর্তমানে তিনি ছোট পরিসরের একটি দোকানে বসে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
একই অভিজ্ঞতা পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারের শহীদুল হকের। স্কুলের গণ্ডি পেরুলেও সামর্থ্যের অভাবে আর কলেজে পড়া হয়নি। ফলে কোনো ভালো চাকরি পাননি শহীদুল। তবে বিকাশের এজেন্ট হওয়ার পর বর্তমানে মোটামুটি সচ্ছল জীবনযাপন করছেন তিনি। এভাবে মোবাইল ব্যাংকিং তরুণদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উত্স হয়ে উঠেছে। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন শহরের অলিগলি আর গ্রামগঞ্জ ও হাটবাজারে বিকল্প কর্মসংস্থানের উত্স হয়ে উঠেছে মোবাইল ব্যাংকিং।
মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চার লাখ এজেন্টের বেশির ভাগই অন্য ব্যবসায় জড়িত থাকলেও সেবা দেয়ার জন্য লোকবল নিয়োগ করতে হয়েছে তাদের। অনেক স্বল্প শিক্ষিত তরুণও মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট ও পরিবেশক হয়ে নতুন এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
প্রতিবেদন মতে, ২০১২ সালের মার্চে এ সেবায় নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল চার লাখ। কিন্তু ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ১ কোটি ৩২ লাখ ও চলতি বছরের জুনে ১ কোটি ৬৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। তবে নিবন্ধিত অর্ধেকেরও বেশি গ্রাহকের হিসাব সচল নেই। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সচল হিসাব ছিল ৬৫ লাখ। চলতি বছরের জুনে সচল হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭ লাখ।
মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় ২০১২ সালের মার্চে প্রায় ২৬ মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে লেনদেন হয় ৮৫৭ মিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জুনে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ডলার লেনদেন হয় এর মাধ্যমে।
মোবাইল ব্যাংকিং সেবা জনপ্রিয় হওয়ার ফলে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবসা এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া অর্থ প্রদান ও গ্রহণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও আর নেই। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন এ সেবার মাধ্যমে।
বাংলাদেশে ২০১০ সালে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশে শুধু ব্যাংকিং মডেলে এ সেবা প্রদানের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংক এ সেবা চালুর অনুমতি নিলেও ২০টি ব্যাংক সেবাটি চালু করেছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানের জন্য পৃথক সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ সৃষ্টি করেছে। ফলে এ সেবার বড় অংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেবার দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং। এছাড়া সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক ‘এমক্যাশ’, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ‘মাইক্যাশ’, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ‘ইউক্যাশ’, ওয়ান ব্যাংক ‘ওকে’, ব্যাংক এশিয়া ‘হ্যালো’ নামে এ সেবা পরিচালনা করছে। পাশাপাশি এনসিসি, ন্যাশনাল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, যমুনা ও কমার্স ব্যাংক সিওর ক্যাশের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনা করছে।
জিএসএমএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় পৃথক নজর দেয়া, শুরু থেকেই পাইলট প্রকল্প না করে বৃহত্ আকারে যাত্রা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় সাবসিডিয়ারি কোম্পানিকে দিয়ে সেবা পরিচালনার সুযোগ থাকায় এ সেবা বিকাশের প্রবৃদ্ধি দ্রুততর হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিকাশের প্রধান নির্বাহী কামাল কাদির বলেন, ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রেখে চলছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। আমরা শুরু থেকেই জোরালোভাবে সেবাটি দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফলে উপকারভোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে।’
এদিকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নীতিনির্ধারণী অবদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যালায়েন্স ফর ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন পলিসি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে অনুষ্ঠিত অ্যালায়েন্স ফর ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের বিশ্বনীতি ফোরামে এ ঘোষণা দেয়া হয়। অ্যালায়েন্স ফর ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক রেগুলেটরদের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, যেটি বিশ্বব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তীকরণ জোরদারের জন্য কাজ করছে।
Discussion about this post