বিদেশী ঋণ ব্যবহারের শর্ত ভঙ্গ করছে করপোরেটরা। বিনিয়োগের শর্তে আনা এ ঋণ ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় ব্যাংকের দায় পরিশোধে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পর এবার বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে অনন্ত অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশী ঋণ দায় পরিশোধে ব্যবহার করায় কর্মসংস্থানে ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়ছে না। উপরন্তু সংকুচিত হচ্ছে দেশীয় ব্যাংকের ব্যবসা।
২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে ৬১৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরাও বিদেশী ঋণের অনুমোদন পাওয়ায় এর ব্যবহার খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতেই উঠে আসে বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের বিষয়টি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও নেদারল্যান্ডসের এফএমও থেকে ঋণ এনে উচ্চসুদের দেশীয় ঋণ পরিশোধ করেছে অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেড; যাতে লঙ্ঘিত হয়েছে বিনিয়োগ বোর্ডের ঋণের অনুমতি শর্ত। এ ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে দুঃখ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকটি। আর অনন্ত অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিনিয়োগ বোর্ডকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব বিদেশী ঋণ বিনিয়োগ বোর্ড অনুমোদন দিয়ে থাকে। তবে আমরা বিশেষ উদ্যোগে বিদেশী ঋণের ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের বিষয়টি ধরা পড়েছে। বিষয়টি বিনিয়োগ বোর্ডের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেও জানানো হয়েছে।’
বিনিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণ অনুমোদন-সংক্রান্ত বাছাই কমিটির অনুমোদনক্রমে মেসার্স অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেডের অনুকূলে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে আইএফসির রয়েছে ৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ও নেদারল্যান্ডসের এফএমওর ৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার। সুদহার ছয় মাস মেয়াদি লন্ডন আন্তঃব্যাংক হারের সঙ্গে অতিরিক্ত সাড়ে ৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৮ মিলিয়ন ডলার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশী ঋণ স্থানীয় মুদ্রায় নগদায়ন করে ২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর অনন্ত অ্যাপারেলসের চলতি হিসাবে জমা করা হয়। একই তারিখে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে অনন্ত অ্যাপারেলসের বকেয়া ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা সমন্বয় করা হয়। পরদিন ২১ অক্টোবর একই হিসাব থেকে চেকের মাধ্যমে প্রাইম ও ইস্টার্ন ব্যাংকের বকেয়া ৩৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাঁচপুরের নয়াবাড়ীর প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্য আইএফসি ও এফএমও থেকে অনন্ত অ্যাপারেলসের ঋণ অনুমোদন করা হয়। অনন্ত অ্যাপারেলস প্রকল্পটি কাঁচপুর থেকে আদমজি ইপিজেডে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প সম্প্রসারণের নামে অর্থ উত্তোলন করে স্থানীয় ব্যাংকের দায় শোধ করেছে।
এ বিষয়ে অনন্ত অ্যাপারেলসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য দিতে রাজি হননি কেউ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট ইউনিটের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ৩৩টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে তারা বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান এ ঋণ নিয়ে দেশীয় ঋণ পরিশোধ করেছে। আবার আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঋণপত্রের ঋণ শোধে ব্যবহার করেছে এ অর্থ। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ছয় মাস অন্তর প্রতিবেদন জমা দেয়ার সুপারিশ করেছে তারা।
বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ কয়েক দফায় বিদেশী ঋণ পেয়েছে। ওয়াইম্যাক্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলালায়নও ঋণ পেয়েছে। বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে— গ্রামীণফোন, ওরাসকম টেলিকম (বাংলালিংক), এয়ারটেল, রবি, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার ও বেক্সিমকো লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিদেশী ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্লেষণমুখী আচরণ করছে না। এসব ঋণের সদ্ব্যবহার হচ্ছে কিনা, খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানও এসব ঋণের সুযোগ পাচ্ছে কিনা, বাংলাদেশ ব্যাংককে তা নিশ্চিত হতে হবে। ব্যাংক গ্যারান্টি দেয়ার ক্ষেত্রে ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ঋণ অনুমোদন দেয়া কমিটিকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। সবাইকে এ ঋণ দেয়া যাবে না। সব মিলিয়ে এখন সময় এসেছে এ ঋণের শতভাগ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার।
Discussion about this post