কয়েক মাস ধরেই ব্যাংকিং খাতে অন্যতম আলোচিত বিষয় বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের অব্যাহত বৃদ্ধি। দেশের ভেতরে ঋণের ভারে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানও অনায়াসে বিদেশী ঋণের অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক বছরে বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিক ঋণ ৫৫০ কোটি ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। নিজেদের ব্যবসা হারানোর পাশাপাশি বিদেশী ঋণের গ্যারান্টার হয়ে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কপালে এরই মধ্যে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে।
গত ২১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায়ও বিষয়টি তুলে ধরেন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা। মুদ্রানীতিতে ঘোষিত ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন না হওয়ার জন্য বিদেশী ঋণকে দায়ী করেন তারা। যদিও এসব ঋণের সদ্ব্যবহার নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তদারকি শুরু করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, বিদেশী ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্লেষণমুখী আচরণ করছে না। আবার বায়ার্স ক্রেডিটের সুদহার কম মনে হলেও কার্যক্ষেত্রে অনেক সময় তা বেশি হয়ে যাচ্ছে। এসব ঋণের সদ্ব্যবহার হচ্ছে কিনা, খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানও এর সুযোগ নিচ্ছে কিনা, বাংলাদেশ ব্যাংককে তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টি দেয়ার ক্ষেত্রেও ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ঋণ অনুমোদন কমিটিকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে, যাতে সবাই এ ঋণ না পায়। সব মিলিয়ে সময় এসেছে এ ঋণের শতভাগ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট ইউনিটের বৈদেশিক উত্স থেকে বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণসংক্রান্ত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে ৪১ কোটি ২৬ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৩০ কোটি ২৭ লাখ, ২০১১ সালে ৯৩ কোটি ৬৩ লাখ, ২০১২ সালে ১৫৭ কোটি ৯৫ লাখ ও ২০১৩ সালে ১৫৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলার ঋণ অনুমোদন করে বিনিয়োগ বোর্ডের এ-সংক্রান্ত কমিটি। এর বাইরে বায়ার্স ক্রেডিটের মাধ্যমে ৩২০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
৩৩টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে চিফ ইকোনমিস্ট ইউনিটের কর্মকর্তারা দেখতে পান, একটি প্রতিষ্ঠান এ ঋণ নিয়ে স্থানীয় ঋণ পরিশোধ করেছে। আবার আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঋণপত্রের ঋণ শোধে ব্যবহার করেছে এ অর্থ। এ পরিপ্রেক্ষিতে সুপারিশ করা হয়, ঋণ সদ্ব্যবহারের জন্য ছয় মাস পর পর প্রতিবেদন জমা দিতে বলা যেতে পারে।
এ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের বিমান সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ কয়েক দফা ঋণ পেয়েছে; যার নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে এরই মধ্যে দেশে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ এয়ারলাইনসটির উড়োজাহাজে ত্রুটি ধরা পড়েছে। এছাড়া ওয়াইম্যাক্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলালায়নও ঋণ পেয়েছে; যাদের ব্যবসায় এরই মধ্যে মন্দা শুরু হয়েছে। বেক্সিমকো লিমিটেড বিদেশ থেকে ৩৫ কোটি ডলার সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছে। এসব ঋণ শোধ করতে না পারলে গ্যারান্টি দেয়া স্থানীয় ব্যাংককে ঋণ সৃষ্টি করে তা শোধ করতে হবে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ায় রিজার্ভে ধাক্কা লাগতে পারে।
দেখা গেছে, বিদেশী মুদ্রায় আয় নেই, এমন বহুজাতিক ও দেশী প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকছে বিদেশী ঋণের দিকে। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় বাজার থেকে ডলার ক্রয় করে এ ঋণ শোধ করতে হবে। বহুজাতিক বাংলালিংক, গ্রামীণফোন, সিটিসেল, রবি, এয়ারটেল, হোলসিম, নেসলেসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঝুঁকছে এসব ঋনে। আবার দেশী আকিজ শিপিং, ইনসেপটা, সামিট, স্কয়ার, ইউনাইটেড, বেক্সিমকো, এপেক্স, বাংলালায়ন, এশিয়ান পেইন্ট, অনন্ত গ্রুপ, আবুল খায়ের, প্রাণ, হা-মিম, খুলনা পাওয়ার, মবিল যমুনা, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপউয়ার্ড, নভোএয়ার, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, পাওয়ার গ্রিড, বিএসআরএম, কেডিএস, কেএসআরএমসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠান বিদেশী ঋণের সুযোগ পেয়েছে। এর বেশির ভাগেরই বিদেশী মুদ্রায় আয় নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, কম সুদ হওয়ায় সবাই বিদেশী ঋণের দিকে ঝুঁকছে। এতে দেশী ব্যাংকগুলোও সুদ কমাচ্ছে। তবে বিদেশী ঋণের সদ্ব্যবহার এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। বিষয়টি ভেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সাড়ে ১৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও গত মে শেষে প্রকৃত অর্জন ১১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মানিটরি পলিসি বিভাগের প্রদিবেদনে বলা হয়েছে, অবকাঠামো সমস্যা, পর্যাপ্ত ব্যবসায়িক আস্থার অভাব ও বৈদেশিক উত্স থেকে ঋণ চাহিদা মেটানোর কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ সরবরাহ বৃদ্ধির হার মন্থর রয়েছে। একইভাবে জুলাই-মার্চ সময়ে মেয়াদি শিল্পঋণ বিতরণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আমদানিকারকরা বহিঃউত্স থেকে সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ পাওয়ায় দেশী উত্স থেকে ঋণের চাহিদা কমে গেছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, মুদ্রানীতিতে ঘোষিত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে না পারার অন্যতম কারণ কম সুদের বিদেশী ঋণ। এতে দেশী ব্যাংকগুলোর ব্যবসা কমে যাওয়ায় মুনাফায় আঘাত পড়েছে। এমন অনেক ব্যবসায়ী ঋণ পেয়ে যাচ্ছেন, যা আশঙ্কার কারণ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোই ২০১২ সালে বিদেশী ঋণ অনুমোদন বেশি পেয়েছে; যেসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বড় অঙ্কের বিদেশী ঋণ পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে— গ্রামীণফোন ৩৫ কোটি ৫ লাখ, ওরাসকম টেলিকম (বাংলালিংক) ১৭ কোটি, এয়ারটেল দুই দফায় ৩০ কোটি ও রবি ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ অনুমোদন পায়। এছাড়া সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার ১৯ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন পায়। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিরই বৈদেশিক আয় নেই।
Discussion about this post