ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মকর্তার হার দিন দিন কমছে। যারা আছেন, তাদের বেশির ভাগই এন্ট্রি ও মিড লেভেলের কর্মকর্তা। এ হার আবার সবচেয়ে কম বেসরকারি ব্যাংকে। নারী কর্মকর্তার হার কমে যাওয়ার এ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে। যদিও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংকের এন্ট্রি লেভেল, মিড লেভেল ও সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট সবক্ষেত্রেই নারী কর্মকর্তার হার কমছে। ২০১৩ সালে ব্যাংকিং খাতে এন্ট্রি লেভেলে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৭০ শতাংশে। এছাড়া মিড লেভেলে ২০১৩ সালে নারী কর্মকর্তার হার ছিল ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত বছর তা নেমে আসে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশে। আর সিনিয়র ম্যানেজমেন্টে ২০১৩ সালে ব্যাংকে ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ নারী কর্মকর্তা থাকলেও গত বছর তা নেমে আসে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশে।
নারী কর্মকর্তার হারে ব্যাংকভেদে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কমিটির মানবসম্পদ ও যোগাযোগ দুটি বিভাগেরই নেতৃত্বে রয়েছেন নারী কর্মকর্তা। মানবসম্পদ বিভাগের নেতৃত্বে রয়েছেন ফাতেমা রিজওয়ানা, যোগাযোগ ও সার্ভিস কোয়ালিটি বিভাগের নেতৃত্বে রয়েছেন জারা জাবীন মাহমুদ। তবে বেসরকারি খাতেরই আরেক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের চিত্র ঠিক এর উল্টো। ব্যাংকটির ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনো পদেই নারী কর্মকর্তা নেই। একই অবস্থা বেসরকারি খাতের আরো অনেক ব্যাংকেরই।
বয়সভিত্তিক নারী কর্মকর্তার হারও কমছে ব্যাংকিং খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে ব্যাংকে ৩০ বছরের কম বয়সী নারী কর্মকর্তার হার ছিল ২০ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশে। ৩০-৫০ বছর বয়সী নারী কর্মকর্তার হার ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ থেকে ২০১৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশে। আর ব্যাংকে ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারী কর্মকর্তার হার ছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা নেমে আসে ৬ দশমিক ৯১ শতাংশে।
জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এন্ট্রি লেভেলে যোগ্যতা অনুযায়ী পুরুষ ও নারী কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। তবে নারী কর্মীরা মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেলে অনেকেই আর ফিরে আসেন না। অনেকে ফিরে এলেও মানিয়ে নিতে না পেরে চাকরি ছেড়ে দেন। এ কারণে ব্যাংকে সিনিয়র পদে নারী কর্মীর সংখ্যা কম।
তিনি বলেন, এখন নারী কর্মীদের অফিস সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিতে হয়। ব্যাংকিং তো চ্যালেঞ্জিং পেশা। অফিস সময়ের পরও এখানে কাজ করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নারী কর্মীদের ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী কর্মীদের নির্ধারিত সময় পর অফিসে না রাখারও নির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার কারণে অনেক সময় ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয় না, যা নারীর উন্নয়ন, অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায়। এ কারণে নারী কর্মীদের ছুটি ভোগের বছরে তাদের বার্ষিক কর্ম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের বছর বা পূর্ববর্তী তিন বছরের গড়ের মধ্যে যেটি উত্তম, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্যাংকের নারী কর্মকর্তাদের যথাযথ সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন নির্দেশনা ও নীতিমালা করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো অভিযোগ এলে তাও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে ব্যাংকিং খাতে এন্ট্রি ও মিড লেভেল এবং সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদেও নারীদের অংশগ্রহণ কমছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ২৭ শতাংশে।


Discussion about this post