আর্থিক খাতের সংকট শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই সীমাবদ্ধ নেই। একের পর এক জালিয়াতি ও নিম্নমানের গ্রাহকদের ঋণ দেয়ার কারণে বেসরকারি ব্যাংকেও সংকট নেমে এসেছে। ব্যাংকগুলোর শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা যাচাইয়ের জন্য যেসব চালক আছে, তার সব কটিতেই বেসরকারি ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে অবনতিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং ব্যবসা এমনিতেই ঝুঁকিনিবিড়। আর যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দিয়ে আদায় করতে না পারলে তা ব্যাংকের পুরো কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে বেসরকারি ব্যাংকের টালমাটাল চিত্রই ফুটে উঠেছে। শেয়ারহোল্ডার ও সম্পদের বিপরীতে মুনাফা কমছে, বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। প্রথমবারের মতো কমে এসেছে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি ব্যাংকের শেয়ারের অংশও।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সূচকগুলোর অবস্থান সম্পর্কিত আইএমএফের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১০ সালে বেসরকারি ব্যাংকের নন-পারফর্মিং ঋণ ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১২ সালে তা দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশে। আর গত জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে। ব্যাংকের মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়া মানে ব্যাংকটির অবস্থা অধোগতির দিকে যাওয়া।
একইভাবে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটিও অবনতির দিকে যাচ্ছে। ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা তাদের বিনিয়োগের কী হারে মুনাফা পাচ্ছেন, তার ধারণা পাওয়া যায় রিটার্ন অন ইকুইটির মাধ্যমে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো ২০১০ সালে বিনিয়োগের বিপরীতে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ মুনাফা পেলেও ২০১২ সালে পেয়েছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৩ সালের জুনে তা হয়েছে ৫ শতাংশে।
আবার সম্পদের বিপরীতে কী হারে মুনাফা হচ্ছে, তা বোঝা যায় রিটার্ন অন অ্যাসেটের মাধ্যমে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো ২০১০ সালে মুনাফা পেয়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ। আর ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়ায় দশমিক ৯ শতাংশে। ২০১৩ সালের জুনে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাসান জামান এ বিষয়ে বলেন, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর সূচকের অবনতি হয়েছে, তা আবার ঠিকও হয়ে আসবে। এসব ব্যাংকের সার্বিক অবস্থাকে খারাপ বলা যায় না। তবে দু-একটির অবস্থা খারাপ হতে পারে।
এদিকে শীর্ষ পাঁচ বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, যখন কোনো একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় ভালো করে, তখন সব ব্যাংকই তাকে অর্থায়নের দিকে ঝুঁকছে। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানটি কোনো কারণে ব্যর্থ হলে সব ব্যাংকই বিপাকে পড়ছে। চট্টগ্রামের কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী, ভোগ্যপণ্য, জাহাজ শিল্প, আবাসন খাত, শেয়ারবাজার, হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ ও আনন্দ গ্রুপ বেসরকারি ব্যাংকিং খাতকে এ অধোগতিতে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সাতটি সূচকের ভিত্তিতে দেখা গেছে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে আইসিবি ইসলামিক, বাংলাদেশ কমার্স, প্রিমিয়ার ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে— রিটার্ন অন অ্যাসেট, রিটার্ন অন ইকুইটি, নন-পারফর্মিং ঋণ, শেয়ারপ্রতি আয়, শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য, শাখাপ্রতি আয় ও ক্যাপিটাল এডুকুয়েসি রেশিও (সিএআর)।
এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকে অনিয়ম বাসা বেঁধেছে। তার প্রভাবই পড়েছে বেসরকারি ব্যাংকে। তবে সরকারি ব্যাংকের মতো কোনো দিনই সরকার আমাদের বিশেষ প্রণোদনা দেবে না। আমাদের বিষয় নিজেদেরই সামাল দিতে হবে। রাইট শেয়ার ইস্যু ও সাবঅর্ডিনেন্ট বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংকট মেটাতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আমাদের সময় দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে।’
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থার প্রতিনিয়ত অবনতির পেছনে দুর্বল করপোরেট ব্যবস্থাপনাও দায়ী বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজে হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা পালন করা হচ্ছে না। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের নির্দেশেই চলছে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা। এমনকি শাখাপর্যায়ের ঋণও দেয় হচ্ছে পরিচালকদের ইচ্ছায়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় হল-মার্ক ও বিসমিল্লাহ ও আনন্দ শিপইয়ার্ডের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায়।
ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় নুরজাহান, বেক্সিমকো ও ইলিয়াস ব্রাদার্স। আনন্দ শিপইয়ার্ড ইসলামী, জনতা, এবি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক থেকে বের করে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামের মোস্তফা গ্রুপ প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিপাকে ফেলে ব্যাংকগুলোকে। বিসমিল্লাহ গ্রুপও বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বের করে নেয়। আবার হল-মার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকের বাইরে বেসরকারি ব্যাংক থেকেও হাতিয়ে নেয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো হলো— উত্তরা, শাহজালাল ইসলামী, যমুনা, আল-আরাফাহ ইসলামী, প্রাইম, ব্যাংক আল-ফালাহ, ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট, এনসিসি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, ওয়ান, ব্র্যাক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, মার্কেন্টাইল, প্রিমিয়ার, সিটি, সোস্যাল ইসলামী, ন্যাশনাল, আইএফআইসি, এক্সিম ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, অতিমাত্রায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকে পড়াসহ গুটি কয়েক বড় গ্রুপকে ১০-১২টি ব্যাংক একসঙ্গে অর্থায়ন করার কারণেই বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো এ অবস্থায় এসেছে। তবে এজন্য ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাবই মূলত দায়ী। নিয়মনীতি মেনে ব্যাংকগুলো আবারো আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2013/12/11/25281#sthash.bcDh1lLD.dpuf
Discussion about this post