উচ্চমূল্যের লাইসেন্স, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও গ্রাহক ধরে রাখায় ব্যর্থতা— মোটা দাগে এ তিন কারণে ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলালায়ন কমিউনিকেশন্স। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নিয়মিত তা পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ঋণখেলাপির তালিকায় উঠে এসেছে বাংলালায়নের নাম। একই পথে অন্য ব্যাংকগুলোর ঋণও। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলালায়নসহ সানম্যান গ্রুপের সব ঋণ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছেন গ্রুপের কর্ণধার মেজর (অব.) এমএ মান্নান।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে ভালো গ্রাহক হিসেবে এখন আর পরিচিতি নেই বাংলালায়নের। শুরুতে লেনদেনে ভালো থাকলেও কয়েক বছর ধরে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। খেলাপি হয়ে পড়ায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সম্প্রতি সব ব্যাংককে চিঠি দিয়ে বাংলালায়নের সঙ্গে লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাজমুস সালেহীন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলালায়নের ঋণ আগেও খেলাপি হয়েছিল। তখন পুনঃতফসিল করা হয়। নতুন করে আবারো ঋণটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। ব্যবসা ভালো না হওয়ার দাবি করে আসছে তারা। তবে বাংলালায়নের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। শিগগিরই ঋণটি পুনঃতফসিল করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
জানা গেছে, ২০০৯ সালের নভেম্বরে এবি ব্যাংকের নেতৃত্বে নয়টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলালায়নকে ১৭১ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ দেয়। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— সোনালী, অগ্রণী, জনতা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, মার্কেন্টাইল, ইউসিবিএল, ইডকল ও সাবিনকো। এবি ব্যাংকের কাছে বাংলালায়নের দায় বর্তমানে প্রায় ৬০ কোটি ও কমার্স ব্যাংকে ৪ কোটি টাকা। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকেও বাংলালায়নের ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার পুরোটাই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া আরো কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এসব ঋণ বর্তমানে নিয়মিত থাকলেও প্রায়ই কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলালায়নের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মহসিন রেজা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তরঙ্গ বরাদ্দ ও লাইসেন্স ফি বাবদ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকের ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করা যাচ্ছে না। তবে ঋণ নিয়মিত করার উদ্যোগ নিচ্ছি আমরা।’
ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক উন্নয়নে ২০১১ সালে ৪০০ কোটি টাকার কনভার্টিবল জিরো কুপন বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। বন্ড বিক্রির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহে ওই বছরই দেশে ও দেশের বাইরে রোড শো করে বাংলালায়ন। পরে ২০১২ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ডের মাধ্যমে ১৩০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। শেয়ারহোল্ডারদের বাইরে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা অভিহিত দরের এ বন্ড বিক্রির অনুমোদন পায় ওয়াইম্যাক্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি। বন্ডের ইস্যু ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স কোম্পানিকে (আইআইডিএফসি)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৩০ কোটি টাকার মধ্যে এবি ব্যাংকের ৫৭ কোটি টাকা এরই মধ্যে পরিশোধ করেছে বাংলালায়ন। বাকি অংশ এখনো বকেয়া রয়ে গেছে। এ বন্ডের মেয়াদ তিন থেকে সাত বছর।
বাংলালায়নের অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫০ কোটি টাকার বেশি। বাংলালায়নের মোট শেয়ার সংখ্যা ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোর। আর ব্যক্তিগত শেয়ারের সংখ্যা নয় লাখ। ৬০০ জনেরও বেশি জনবল রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
২০০৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় বাংলালায়ন। ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর লাইসেন্স পাওয়ার পর একই বছরের ২৮ নভেম্বর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে তারা। পরে ২০১১ সালের ৭ মে এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর হয়।
ব্রডব্যান্ড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস (বিডব্লিউএ) লাইসেন্সের আওতায় বর্তমানে দেশে তিনটি প্রতিষ্ঠান ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। বাংলালায়ন ছাড়াও কিউবি ও ওলো নামে অন্য দুটি প্রতিষ্ঠান এ সেবা দিচ্ছে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নিলামের মাধ্যমে ২১৫ কোটি টাকা দিয়ে বিডব্লিউএ লাইসেন্স নেয় বাংলালায়ন ও কিউবি। আর ওলো এ লাইসেন্সের আওতায় সেবা সরবরাহ করে ২০১৩ সালে।
বিডব্লিউএ নিলামে উচ্চদরের পেছনে বাংলালায়নের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের নিলামের ক্ষেত্রে এ দর বিশ্বের সর্বোচ্চ। এর আগে সিঙ্গাপুরে প্রতিটি ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের জন্য দর উঠেছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সে সময়ই ওয়াইম্যাক্স খাতে এ বিনিয়োগকে হঠকারী বলে মত দিয়েছিলেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির উন্নয়নকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক বছরের মধ্যে উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যন্ত্রাংশ উত্পাদন বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে লাইসেন্স ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করে ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তিনির্ভর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো বিপাকে পড়ে বাংলালায়নও।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে এলটিই (লং টার্ম ইভ্যালুয়েশন) প্রযুক্তি চালুর অনুমোদন দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করে বাংলালায়ন। আবেদনে বলা হয়, দেশে বিডব্লিউএ লাইসেন্সের ১৫ বছর মেয়াদকালে এ প্রযুক্তি বাংলাদেশে আর্থিকভাবে সক্ষম থাকবে না। এছাড়া উন্নয়ন থেমে যাওয়ায় আগামী ১০-১২ বছর পর্যন্ত ওয়াইম্যাক্সের প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া কঠিন হবে। ওয়াইম্যাক্সের সঙ্গে এলটিই প্রযুক্তির চালুর অনুমোদন দেয়া হলে নিজেদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রাহকদের আরো ভালো সেবা দেয়া সম্ভব হবে। ২০১৩ সালে বাংলালায়নসহ বিডব্লিউএ লাইসেন্সধারী তিন প্রতিষ্ঠানকে এলটিই সেবা চালুর অনুমোদন দেয় বিটিআরসি।
উল্লেখ্য, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের আইইইই ৮০২ মানদণ্ড অনুযায়ী ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিডব্লিউএ লাইসেন্সের আওতায় ৩৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ পেয়েছে বাংলালায়ন।
এ প্রসঙ্গে বাংলালায়নের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) শফিকুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে বাংলালায়ন। শিগগিরই এলটিই প্রযুক্তির সেবা চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে। এলটিইর মাধ্যমে এ ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে আশা করছি।
২০১৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহক হারিয়ে চলেছে ওয়াইম্যাক্স প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০১৩ সালের জুনে পাঁচ লাখের বেশি গ্রাহক ছিল ওয়াইম্যাক্স অপারেটরদের। চলতি বছরের জুন শেষে এ গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজারে। গ্রাহক হারিয়েছে বাংলালায়নও।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৭৪। ২০১২ সালে তা বেড়ে হয় ৩ লাখ ২৯ হাজার ৯০৯। এর পর থেকেই গ্রাহক সংখ্যা কমতে থাকে। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৮০ হাজার ও ২০১৪ সালে প্রায় দুই লাখ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকসংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের মতো। শুধু চালু রয়েছে, এমন সংযোগকেই এ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তরঙ্গ বরাদ্দ ও আয় ভাগাভাগির অংশ বাবদ সরকারের প্রাপ্য অর্থও নিয়মিত পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে বাংলালায়নের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তরঙ্গ বরাদ্দ, আয় ভাগাভাগির অংশ ও বিলম্ব ফি বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে সরকারের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি টাকা। পাওনা পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিসও দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে কিছু অর্থ প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ করলেও তা নিয়মিত নয়।
Discussion about this post