ঋণপত্র (এলসি) ছাড়াই শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করা যাবে। শুধু এলসিএ (ঋণপত্র অনুমোদন) ফরমের মাধ্যমে এ আমদানির সুযোগ দিতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে অনাপত্তি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। চলতি সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি কার্যকর করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
তবে এ পদ্ধতিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তাদের মতে, এলসির মাধ্যমে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংক অনেক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ঋণপত্র খোলে। এলসিএ পদ্ধতিতে সবকিছুই করবেন ব্যবসায়ীরা। ফলে অনিয়ম হলেও তা ধরার সুযোগ থাকবে না। এছাড়া ব্যাংকের আয়ও কমে আসবে এতে।
ঋণপত্র মূলত ব্যাংক ও পণ্য সরবরাহকারীদের মধ্যে একটি চুক্তি, যাতে ব্যাংক আমদানিকারকের পক্ষে পণ্যের অর্থ পরিশোধে বাধ্য থাকে। এলসিএ ফরম মূলত সরকারি একটি আবেদনপত্র; যাতে পণ্যের নাম, পরিমাণ, মূল্য, মুদ্রার হার উল্লেখ থাকে। বর্তমানে আমদানিতে ঋণপত্র স্থাপন ও এলসিএ ফরম উভয়ই পূরণ করতে হয়। নতুন পদ্ধতিতে শুধু এলসিএ ফরম পূরণ করেই পণ্য আমদানি করা যাবে।
ঋণপত্র ছাড়া এলসিএ ফরম পূরণের মাধ্যমে আমদানির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে আমদানিনীতি আদেশ ২০১২-১৫-এর ৮(৩) ধারায়। ধারাটিতে বলা হয়েছে, টেকনাফ শুল্ক স্টেশনের মাধ্যমে আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি চালানে ৫০ হাজার ডলারের মূল্যসীমা এবং অন্যান্য স্থলপথে ১০ হাজার মূল্যসীমার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী এলসিএ ফরম পূরণের মাধ্যমে আমদানি করা যাবে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতিও মূল্যসীমা নির্বিশেষে ঋণপত্র ছাড়া আমদানি করা যাবে। তবে স্থলবন্দর ছাড়া অন্য মাধ্যমে ঋণপত্র ছাড়া আমদানির ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই আমদানিনীতি আদেশে।
জানা যায়, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠান। ঋণপত্র ছাড়াই এলসিএ ফরম পূরণের মাধ্যমে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ চাওয়া হয় চিঠিতে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, ঋণপত্রে অধিক মাশুলের কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের গতি মন্থর হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় ঋণপত্র ছাড়াই এলসিএ ফরমের মাধ্যমে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ দেয়া প্রয়োজন।
যোগাযোগ করা হলে কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ঋণপত্র ছাড়াই আমদানির সুযোগ চেয়েছি। তবে এখনো সুযোগ দেয়া হয়নি। অনুমোদন পেলে আমরা বিদেশী সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করব আমদানির জন্য। অনুমোদনের পরই বলা যাবে, ব্যাংকের গ্যারান্টি ছাড়া পণ্য আসে কিনা। না এলে আমরা আবারো নীতিটি পর্যালোচনা করব। মূলত ব্যবসার ব্যয় কমাতেই এ আবেদন আমাদের।’
ব্যবসায়ীদের এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মতামত চাওয়া হয়। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণপত্র ছাড়াই শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ রয়েছে। শুধু এলসিএ ফরম পূরণের মাধ্যমেই এ দুই ধরনের পণ্য আমদানি করা যাবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নির্দেশে ঋণপত্র খোলা ছাড়াই শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করে এ অনুমতি দেয়া হবে।
জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এলসিএ নতুন একটি বিষয়। সব ধরনের শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে এটি চালু হচ্ছে। আপাতত দেড় মাসের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা হচ্ছে। কোনো সমস্যা না হলে আমদানিনীতিতে এটি যুক্ত হবে। আর সমস্যা হলে এটি বাতিল করা হবে।’
এর আগে বেক্সিমকো ও দেশবন্ধু গ্রুপ ঋণপত্র ছাড়াই পণ্য আমদানির জন্য আবেদন করে। দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা এ প্রসঙ্গে বলেন, ঋণপত্রে ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হচ্ছে। আবার ব্যাংকের সুদ আছে। এত ব্যয় করে ব্যবসা দাঁড় করানো কঠিন। এছাড়া বেশির ভাগ দেশে ঋণপত্র নেই। তাদের এ বাবদ মাশুলও গুনতে হয় না। তাই তারা সহজেই ব্যবসা দাঁড় করাতে পারছে।
এদিকে পদ্ধতিটিতে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, এলসিএ পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই সবকিছু করবেন। তবে তাদের অর্থের গ্যারান্টি দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। সেক্ষেত্রে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। প্রজেক্ট ঋণ করে এলসি খোলার পর পণ্য এলেও অনেক ব্যবসায়ী অর্থ পরিশোধ করেন না। এলসিএ হলে ব্যবসায়ীদের ধরার কোনো সুযোগ থাকবে না। তাই ব্যাংক এলসিএতে আগ্রহী নাও হতে পারে। এছাড়া অসাধু ব্যবসায়ীরা এলসিএর সুযোগ নিয়ে অনৈতিক কাজের সুযোগ পাবেন। বিদেশী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতারণা হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হামিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, এলসিএ পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি বাড়বে। অন্যদিকে আয় কমবে। এলসিএর ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিনিয়োগ সুরক্ষিত হতে হবে। তা না হলে এ ধরনের বাণিজ্যে আগ্রহ হারাবে ব্যাংকগুলো।
ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান আলী রেজা ইফতেখার বলেন, যারা সরবরাহকারী, তারা পণ্য না দিলে তো দেশে আসবে না। এখনো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া পণ্য দেন না। যদি ব্যবসায়ীরা নিজেরাই যোগাযোগ করে পণ্য আনতে পারেন, তাহলে ভালো। তবে এতে আমাদের আয় কমে আসবে। কারণ ঋণপত্র থেকে যে মাশুল পাওয়া যায়, তা বন্ধ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে এলসিএ ফরমে নতুন করে মাশুল নির্ধারণ করতে হবে।
Discussion about this post