রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনাকে ঘিরে গভর্নরের পদ থেকে অবশেষে সরে দাঁড়ালেন ড. আতিউর রহমান। দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যে এ ঘটনার নৈতিক দায় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গতকাল পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে অব্যাহতি দেয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে। আর বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি অপারেশন ও অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এবং মহাব্যবস্থাপককেও বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে, যা বাস্তবায়ন করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার খোয়া যায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি। অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানতে পারে এক মাস পর। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসছে বলেও সোমবার ইঙ্গিত দেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনের জন্য গতকাল দিনও ঠিক করেন তিনি। তবে ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর নির্ধারিত ওই সংবাদ সম্মেলন বাতিল করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়ার ঘটনায় আতিউর রহমানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় গত সোমবার দুপুরে। ওইদিন বিকালেই অর্থ সচিব এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করেন অর্থমন্ত্রী। ওই বৈঠকেই নতুন গভর্নর হিসেবে ফজলে কবিরের নাম চূড়ান্ত করা হয়। পাশাপাশি ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও চূড়ান্ত হয় ওই বৈঠকে।
গভর্নরের পদত্যাগ: দিল্লি সফর শেষে সোমবার দেশে ফেরার পর থেকেই দেশব্যাপী আলোচনার বিষয় ছিল গভর্নর পদে ড. আতিউর রহমানের থাকা না থাকা নিয়ে। এর মধ্যেই গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। তার এ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ব্যাংকের অদক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন বলে উল্লেখ করেন ড. আতিউর রহমান।
পরে বিকালে এ নিয়ে গুলশানের বাসায় আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেন ড. আতিউর রহমান। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আপনারা জানেন কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশে কী ঘটছে। আমি চাই না বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে কোনো বিতর্ক হোক। আমি চাইনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তির সমস্যা হোক। সেজন্যই নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছি।
যে ঘটনার জন্য এত বিতর্ক হচ্ছে, সেখানে অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে বলে জানান ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেন, আমরা সংকটটাকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে চাই। এটা এমন এক অ্যাটাক (হামলা), যা কোত্থেকে কীভাবে এসেছে, আমরা এখনো জানি না। এখনো তদন্ত হচ্ছে। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, এটা হাই-টেক (উচ্চপ্রযুক্তি) সাইবার অ্যাটাক। এটা অনেকটা টেরোরিস্ট অ্যাটাকের (সন্ত্রাসী হামলা) মতো। এটা কেমন করে ঘটেছে, কেমন করে আসছে, সেটা আমরা প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি। আমরা খানিকটা হতবিহ্বল ছিলাম। এ আঘাতটা এমন সময় এসেছে, যখন এটিএম কার্ড জালিয়াতি হচ্ছিল। সব মিলিয়ে মোটামুটি অস্পষ্ট ছিল। আমরা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। আমরা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসেছিলাম। র্যাবকে ডেকেছি, এনএসআইকে ডেকেছি। তারা সবাই মিলে চেষ্টা করছে ঘটনাটা কোথায়।
প্রধানমন্ত্রীকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আর অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বিষয়টা জানানো হয়েছে উল্লেখ করে ড. আতিউর রহমান বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত র্যাব এবং এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য যেসব পরিকল্পনা করেছিলাম, আমার উত্তরসূরি নিশ্চয় সেগুলো করবে। ব্যাংকগুলোর এমডিদের সঙ্গে এ বিষয়ে বসেছিলাম। তাদেরও আমি বলেছি কী কী কাজ করতে হবে। আশা করি তারাও সেগুলো করবে; যার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিরাপদ হবে।
ড. আতিউর রহমান বলেন, আমি বাংলাদেশ ব্যাংককে আমার সন্তানের মতো দেখেছি। আমি তিলে তিলে খনি শ্রমিকের মতো ২৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ গড়ে তুলেছি। আর সে রিজার্ভ হারিয়ে যাবে আমার অবহেলায়। সেটা বিশ্বাস করতেও আমার কষ্ট হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসেবে ২০০৯ সালের ১ মে চার বছরের জন্য নিয়োগ পান ড. আতিউর রহমান। পরে তার মেয়াদ আরো তিন বছরের জন্য বাড়ানো হয়। চলতি বছরের ২ আগস্ট তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
দুই ডেপুটি গভর্নরকে অব্যাহতি: ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম। এ সময় তিনি বলেন, রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের দুর্বলতা ছিল। তাই টাকা ফিরিয়ে আনতে রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। পরে ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। একই সঙ্গে অব্যাহতি দেয়া হয় আরেক ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানাকেও। প্রাক-বাজেট আলোচনার আগে সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
ব্যাংকিং সচিব ওএসডি: গভর্নরের পদত্যাগ ও দুই ডেপুটি গভর্নরকে অব্যাহতি দেয়ার পর পরিবর্তন আনা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব পদেও। বেলা ৩টায় ব্যাংকিং বিভাগের সব কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করে ড. এম আসলাম আলম ঘোষণা দেন, এ বিভাগে আজই তার শেষ দিন। সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অফিস করলেও এ বিষয়ে আর কারো সঙ্গে কোনো কথা বলেননি তিনি।

Discussion about this post