চোরাচালানের গরুগুলো মালিকবিহীন অবস্থায় সীমান্ত রেখার আশপাশ থেকে আটক করা হয়। এতে বৈধভাবে আমদানি না হওয়ায় কাস্টমস, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন হয়েছে। কাস্টমসের সংক্ষিপ্ত বিচারাদেশে এমন তথ্যই উপস্থাপন করা হয় রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা ভারতীয় গরু প্রসঙ্গে। অতঃপর নিলাম ডাকে মাত্র ৫০০ টাকায় বৈধতার ছাপ মেরে দেয়া হয় প্রতিটি গরুর গায়ে। এভাবেই চলছে সীমান্তে বাজেয়াপ্ত সম্পদের অর্থনীতি।
ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও রফতানি নিষিদ্ধ থাকলেও মূলত মুনাফার টানে ভারতের কৃষক ও চোরাচালান চক্র এ তত্পরতায় যুক্ত হয়। হরিয়ানার অনুত্পাদনশীল বা বয়স্ক ৫০০ রুপির একটি গরু পশ্চিম বাংলায় ঢুকে হয়ে যায় আড়াই হাজার রুপির। সীমান্তে সে গরুর দাম চড়ে ৫ হাজার রুপি। বাংলাদেশে ৫০০ টাকায় নিলাম ডাকের পর দাম হয়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ। পাইকার-খুচরা ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে সারা দেশের ভোক্তা তা কেনেন ২৫-৩০ হাজার টাকায়।
ভারতীয় প্রখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রতিদিন চোরাচালান হয় ২০-২৫ হাজার গরু-মহিষ। কোরবানির ঈদ ঘিরে তা বাড়ে অসম্ভব রকমে। ধারণা করা হয়, বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় এতে। গোটা লেনদেনই চলে অবৈধ প্রক্রিয়ায়। ঈদ ঘিরে লেনদেনের অঙ্ক হয় বিশাল। এক্ষেত্রে হুন্ডি, স্বর্ণ, তেল হয়ে পড়ে প্রধান বিনিময়মাধ্যম।
সরেজমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরা সীমান্তে বণিক বার্তার নিজস্ব অনুসন্ধানে ভারতীয় ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। বর্তমানে কড়াকড়ির মধ্যেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে গড়ে প্রতিদিন দেড় হাজার গরু ঢুকছে। সাতক্ষীরা কাস্টমস বিভাগের তথ্যমতে, গত ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ৩ লাখ ১০ হাজার ৮৪৭টি গরু-মহিষ বাংলাদেশে ঢুকেছে। অর্থাৎ এ জেলার সীমান্ত দিয়েই গবাদিপশু আসছে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার। সারা দেশে আরো যেসব সীমান্ত জেলা দিয়ে গরু চোরাচালানি হয়, তার মধ্যে অন্যতম যশোর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়। সীমান্তের উত্তর-পূর্ব পাড়ের ভারতীয় প্রদেশ যেমন আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা দিয়েও ঢোকা গবাদিপশুগুলো একই প্রক্রিয়ায় আইনসিদ্ধ হয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক অধ্যাপক ও জনতা ব্যাংকের পরিচালক আরএম দেবনাথ বলেন, এ প্রক্রিয়ায় বড় হচ্ছে অবৈধ অর্থনীতি। এক্ষেত্রে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতরা লাভবান হচ্ছে। এটাকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখা জরুরি। একটা সুরাহাও প্রয়োজন।
তাতে দুই দেশের সরকারই লাভবান হবে।
তবে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে সরকার যে শুল্ক পাচ্ছে, এটাই ভালো। কারণ ধর্মীয় কারণে ভারতের গরু রফতানি বন্ধ। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গরু আমদানি সম্ভব নয়। বাণিজ্য তার নিজস্ব গতিতে চলবে, চাহিদা থাকলে জোগান আসতেই হবে। বাংলাদেশে ভারতীয় কাপড় আমদানি নিষিদ্ধ, কিন্তু কাপড় আসা তো বন্ধ হয়নি। আমদানি বন্ধ করে কিছু অসৎ কর্মকর্তাকে ধনী বানানো হচ্ছে। তাই গরুর ক্ষেত্রে নিলামের মাধ্যমে নামমাত্র যে শুল্ক পাওয়া যায়, তার পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট সীমান্ত ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে চোরাচালানের বাড়তি তোড়জোড়। ভারতের ব্যবসায়ীরা এ দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই গরু পাঠাচ্ছেন। গত শনিবার কানসাটের গুরু ব্যবসায়ী ফয়জুর রহমানকে দেখা যায় দুটি ট্রাকে গরু তুলতে। তিনি ৩১টি গরু পাঠাচ্ছেন নোয়াখালীতে। তার ভাষ্যে, ভারত থেকে আসা এসব গরুর অর্থ শোধ করা হয়েছে নগদ টাকায়। হুন্ডির মাধ্যমে সীমান্তেই মিটে গেছে এ লেনদেন। বেশি গরু এলে স্বর্ণের মাধ্যমেও অর্থ পরিশোধ করা হয়।
এ সীমান্তের ব্যাংকগুলোয় বেড়ে গেছে অর্থ উত্তোলনের চাপ। ইসলামী ব্যাংক চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার ম্যানেজার বদরুল আলম জানান, কোরবানিকে কেন্দ্র করে অর্থ উত্তোলন আগের চেয়ে বেশ বেড়েছে। বিভিন্ন শাখা থেকে এখানে অনলাইন ও টিটির মাধ্যমে অর্থ আসছে। তবে নগদ অর্থের সংকট চলছে বলে জানান রূপালী ব্যাংক চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর শাখার ব্যবস্থাপক জামিলুর রহমান।
এখনো সীমান্তে কড়াকড়ি চলছে উল্লেখ করে শাহজালাল বেপারি জানান, গতবারের মতো সীমান্ত খুলে দিলে একবারেই কয়েক লাখ গরু-মহিষ চলে আসবে। ওপারে গরুও প্রস্তুত রয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের কড়াকড়ি আরোপের বিষয়ে অবগত আছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার আল মামুনও। কানসাট কাস্টমস করিডোরের পরিদর্শক তৈমুর রহমানের কাছ থেকে জানা যায়, চলতি মাসে গত শনিবার পর্যন্ত ছয় হাজার গরু এসেছে, যা গতবারের তুলনায় অনেক কম।
এদিকে সাতক্ষীরার বৈকারী, কুশখালী, তলুইগাছা, কাকডাঙ্গা, ঘোনা, গাজীপুর, ভোমরা, মাদরা, হিজলদী, চান্দুড়িয়াসহ ১৭টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন ভারতীয় চার-পাঁচ হাজার গরু আসছে বাংলাদেশে। অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রতিবেদকের কাছে ব্যবসায়ীরা নানা হয়রানির কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, বাংলাদেশে তারা সরকারের সব বিধিবিধান মেনেই গবাদিপশুর ব্যবসা করছেন। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ৫০০ টাকার সরকারি রাজস্বের রসিদ দিলেও গরুপ্রতি আদায় করছে ৫৩০ টাকা। এছাড়া শিকড়ি, আবাদের হাট, কদমতলা, কলারোয়াসহ বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে। নোয়াখালীর গরু ব্যবসায়ী আবুল তরফদার, রকিব মিয়া ও পানা উল্যা শিকদার জানান, গরু কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় সাতক্ষীরা বৈকারী সীমান্ত থেকে শুরু করে পথে ৮-১০ জায়গায় তাদের চাঁদা দিতে হয়। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, স্থানীয় নানা সংস্থার নামে রসিদ তৈরি করে গরুর ট্রাক থেকে ২০০-৩০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।
তবে সাতক্ষীরা ৩৮ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল এ আর পারভেজ মজুমদার এ প্রসঙ্গে জানান, গরুপ্রতি সরকারের নির্ধারিত রাজস্বের বাইরে যাতে কোনো টাকা-পয়সা লেনদেন না হয়, সে ব্যাপারে বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া কোরবানির ঈদে ব্যাপারিরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন, সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
– See more at: http://www.bonikbarta.com/first-page/2013/10/11/18949#sthash.0aXvD3LP.RAhgwbrM.dpuf

Discussion about this post