সোনালী ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারীর ঘটনায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিতে পড়তে যাচ্ছে ব্যাংকখাত। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা ও আগারগাঁও শাখার কর্মকর্তারা নিয়ম ভেঙ্গে যেসব ঋণপত্র খুলেছিলেন বা স্বীকৃতি প্রদান করেছিলেন তার দায় নিচ্ছে না ব্যাংক। ফলে সোনালী ব্যাংকের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর দায় দাড়িয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এসব অর্থ সোনালী ব্যাংক না দিলে তা ডিসেম্বর ভিত্তিতে শ্রেনীকরন করতে হবে ব্যাংকগুলোকে, যার প্রভাব পড়বে ব্যাংকগুলোর মুনাফায়। অর্থ আদায় না হলে এসব ব্যাংক আদালতেরও সরানপন্ন হবে বলে জানা গেছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত এ প্রসঙ্গেবণিকবার্তাকে বলেন, ‘যেসব কর্মকর্তা নিয়ম ভেঙ্গে ব্যাংকিং করেছেন তাদের দায় ব্যাংক নেবে না। যেসব ব্যাংক ভূয়া স্বীকৃত বিল কিনেছে তাদেরও দায়িত্ব ছিলো বিষয়টি দেখার। তা না করেই তারা বিভিন্ন পার্টির হাতে অর্থ তুলে দিয়েছে। আমাদের ব্যাংকের কর্মকর্তার দোষ আছে, তাদের বিচার হবে। তবে তাদের অপকর্মের দায় ব্যাংক নেবে না। তবে যেসব বিল নিয়ম মেনে তৈরি হয়েছে তা ধীরে ধীরে পরিশোধ করা হবে।’
সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার মাধ্যমে হলমার্ক গ্রুপ অবৈধ পন্থায় ২ হাজার ৬৪৭ কোটি হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক থেকে ফান্ডেড ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৬১০ কোটি ও অন্যান্য ব্যাংক থেকে নন ফান্ডেড ঋণ ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। নন ফান্ডেড ঋণের পুরোটাই গেছে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পর এসব বিল সোনালী ব্যাংকের পরিশোধ করার কথা। কিন্তু এসব বিল ভুয়া ছিলো বলে দাবি করছে সোনালী ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংকের একই শাখা (রূপসী বাংলা হোটেল) থেকে প্যারাগন, ডিএন স্পোর্টস, নকশী নিট, টিঅ্যান্ড ব্রাদার্স ও খান জাহান গ্রুপও একই পন্থায় টাকা হাতিয়ে নেয়। এছাড়া আগারগাঁও শাখা থেকে গ্রীণ প্রিন্টার্স নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ পন্থায় টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুত্রে জানা গেছে, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের কাছে পাওনা চেয়ে চিঠি দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে এসব বিল পরিশোধের জন্য চিঠি দিলে সোনালী ব্যাংক বলছে, এর দায় তারা নেবে না। সোনালী ব্যাংকের ৫ সদস্যের একটি দল যাচাই-বাছাই করে শুধুমাত্র প্রকৃত বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করছে।
সোনালী ব্যাংকের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় শাখায় ২৬ কোটি ও রমনা করপোরেট শাখায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। ব্যাংকটি বেশ কয়েকবার সোনালী ব্যাংককে চিঠি দিয়েও কোন উত্তর পায়নি। ফলে আদালতের শরনাপন্ন হয়েছে তারা।
এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আমিনুর রহমান বলেন, অর্থ আদায়ে আমরা সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের বিরদ্ধে মামলা করেছি। সোনালী ব্যাংক বিল পরিশোধ করবে বলে আমাদের কথা দিলেও এখনও তা বাস্তবায়ন করেনি।
সোনালী ব্যাংকের কাছে ব্র্যাক ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ ২ কোটি টাকার বেশী। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘টাকা আদায়ে আমরা সোনালী ব্যাংককে চিঠি দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তারা কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। এভাবে চললে ব্যাংকগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হবে। আমদানিকারকরাও সংকটে পড়বেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে সোনালী ব্যাংকের উচিত্ দ্রত এ বিল পরিশোধ করা।
সোনালী ব্যাংকের কাছে প্রাইম ব্যাংকের পাওনা সাড়ে ৮ কোটি, সাউথইষ্ট ব্যাংকের প্রায় ২০ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পাবে প্রায় ৩৫ কোটি এবং আল আরাফাহ ব্যাংক পাবে প্রায় ৮ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো সোনালী ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকবে বারবার চিঠি দিলেও অর্থ পায় নি।
জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে কয়েকটি ব্যাংকের বিল কেটে পরিশোধ করে দেয়া হয়েছে। মূলত বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চাপ দিয়ে বিল পরিশোধ করে নিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ডিসেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংক ও তৈরি পোশাক খাত আরো সংকটের মধ্যে পড়বে। নতুন নীতিমালায় শ্রেনীকরণ করতে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানও খেলাপী হয়ে পড়বে। ফলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে। তাই এসব বিল পরিশোধ নিয়ে একটি পৃথক সেল তৈরি করে সমাধার উদ্যোগ নেয়া উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এসব ঘটনায় ২৬ টি ব্যাংকের নাম উঠে আসলেও প্রায় সব ব্যাংকেই এঘটনায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হবে বলে জানান একাধিক কর্মকর্তা।
Discussion about this post