ব্যাংকাররা খুঁজে পাচ্ছেন না চট্টগ্রামভিত্তিক এইচআর গ্রুপের কর্ণধার হারুনুর রশিদকে। ২২টি ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি। গ্রুপটির কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দিনের পর দিন বসে থাকলেও দেখা মিলছে না তার। কাগজে-কলমে ফোন নম্বর থাকলেও সেসব নম্বরে কেউ ফোন ধরে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আশির দশকে জাহাজ ভাঙা শিল্পের মাধ্যমে হারুনুর রশিদের ব্যবসায় হাতেখড়ি। ২০০২ সালে ব্যাংকঋণে গড়ে তোলেন ভোজ্যতেল পরিশোধনাগার। অতঃপর ব্যাংকের অর্থেই আমদানি করেন অপরিশোধিত তেল। পরিশোধনের পর তা বিক্রিও হয়ে যায়। তবে শোধ হয়নি ব্যাংকের পাওনা। বরং অর্থ স্থানান্তর হয়েছে জমি কেনায়। বন্ধ হয়ে গেছে পরিশোধনাগারটিও।
প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর চট্টগ্রামের একাধিক শাখা ব্যবস্থাপক বণিক বার্তাকে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটি ঋণের অর্থ পরিশোধ করছে না। বিভিন্ন বাহক মারফত কথা দিলেও তার কোনোটাই রক্ষা করছেন না হারুনুর রশিদ। ফলে বাধ্য হয়ে তার ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এইচআর গ্রুপ জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় ভালো করার কারণে ব্যাংকগুলো তেল পরিশোধনাগারে অর্থায়নে এগিয়ে আসে। আবার হারুনুর রশিদ স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হওয়ার সুবাদে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ে তদবির করে দ্রুত ঋণ পেয়েছেন। কিন্তু তিনি ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে জমি কিনেছেন। এইচআর গ্রুপের দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে— রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এইচ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, ন্যাশনাল আয়রন অ্যান্ড স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রুবাইয়া প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, চিটাগাং ইস্পাত লিমিটেড ও আমানত স্টিল লিমিটেড।
চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও চিটাগাং ইস্পাতের বিরুদ্ধে চলতি বছরই ওই আদালতে ৫৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণখেলাপির মামলা করেছে অগ্রণী, সাউথইস্ট, মার্কেন্টাইল, এনসিসি, ইসলামী ও ন্যাশনাল ব্যাংক। এর মধ্যে রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে রয়েছে ৪৪৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ছয়টি মামলা। বাকি ১২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার তিনটি মামলা চিটাগাং ইস্পাতের বিরুদ্ধে। এর বাইরেও চিটাগাং ইস্পাতের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ ও আল-আরাফাহর ৮৫ কোটি টাকা। এছাড়া রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে ১০৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার আরো তিনটি মামলা রয়েছে। গত বছর মামলাগুলো করে তিনটি ব্যাংক। এর বাইরে এক্সিম, আল-আরাফাহ, রূপালী, যমুনা, প্রাইম, শাহজালাল ইসলামী ও জনতা ব্যাংকেও রয়েছে বড় অঙ্কের পাওনা, যা নিয়ে মামলা চলছে।
ঋণের অর্থ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতে মামলা করলেও উচ্চ আদালতে বেশির ভাগ মামলাই স্থগিত হয়ে যায়। গ্রুপটির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে অধিকাংশ ব্যাংক। পাশাপাশি চেক ডিজঅনারের ফৌজদারি মামলাও রয়েছে বেশ কয়েকটি।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য এইচআর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হারুনুর রশিদের সঙ্গে নানা সূত্রে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কেউই সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি। চট্টগ্রামে তার অনুপস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন গ্রুপটির মহাব্যবস্থাপক মুস্তাফিজুর রহমান। হারুনুর রশিদের মতো তিনিও গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার রুবেল বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা ব্যাংকের মামলাগুলো স্থগিত করে অর্থ শোধ করার চেষ্টা করছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো অর্থ দেয়া সম্ভব নয়।’
কারখানা বন্ধ থাকলে কোন উত্স থেকে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ হবে— প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে সব ঋণের বিপরীতেই জমি বন্ধক দেয়া আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এমডি স্যারের অনেক ব্যবসা রয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানের অর্থ দিয়ে আপাতত ঋণ শোধ করার চেষ্টা চলছে।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হারুনুর রশিদ (৫৫), তার স্ত্রী আনজুমান আরা বেগম (৪৫) ও ছেলে হুসনাইন হারুনকে (২৭) বিবাদী করা হয়েছে। মামলার আরজিতে বিবাদীদের ব্যবসায়িক ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর শেখ মুজিব রোডে ফারুক চেম্বারের ১১ তলা। আর তাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায়।
চট্টগ্রামের আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান জানান, রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক ও এক ব্যক্তির করা চারটি মামলা রয়েছে তার হাতে। মামলাগুলোয় বাদীরা জামিন নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন।
রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) থেকে জানা যায়, ২০০২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রুবাইয়া ভেজিটেবল ওয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যববস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হারুনুর রশিদ ও চেয়ারম্যান তার স্ত্রী। এছাড়া তার সন্তানরা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক। ২০০৪ সালে উত্পাদনে গিয়ে ২০১১ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল কারখানাটি। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কদম রসুল এলাকায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভোজ্যতেল পরিশোধনাগার। প্রতিষ্ঠানটি অপোরিশোধিত পাম অয়েল আমদানির মাধ্যমে তা পরিশোধন করে ড্রামে করে বাজারে বিক্রি করত।
– See more at: http://www.bonikbarta.com/first-page/2013/12/24/26724#sthash.kf3mFPUH.dpuf
Discussion about this post