এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এক এলাকা। চারদিকে শুধুই ধ্বংসযজ্ঞ। সড়ক বিভাজনের গাছগুলোও বাদ যায়নি তাণ্ডব থেকে। সড়কজুড়ে কয়লার টুকরো, খণ্ড খণ্ড ইটপাথর আর কাচ। গতকাল সোমবার সকালে ব্যাংক ও বাণিজ্যিক পাড়া হিসেবে পরিচিত চিরচেনা মতিঝিলের চিত্র ছিল এমন। এমন ধ্বংসযজ্ঞের পর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ব্যাংকাররা। এমন পরিস্থিতিতে মতিঝিলে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধের কথা ভাবছে সরকার।
ব্যাংকাররা বলছেন, অন্য প্রতিষ্ঠান আর ব্যাংক এক নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই হামলা নিন্দনীয়। কিন্তু ব্যাংকে হামলা আলাদা বিষয়। ব্যাংক স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান। কেননা ব্যাংকে সাধারণ জনগণের আমানত গচ্ছিত থাকে। জনগণের আস্থার ওপর চলে ব্যাংকিং খাত। রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যাংকে হামলা চালালে জনগণের আমানতের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বা বাণিজ্যিক এলাকায় সব ধরনের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোর ওপর হামলায় আমরা উদ্বিগ্ন। এটা কখনো কাম্য নয়।’
জানা গেছে, কিছু দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও মতিঝিল এলাকায় সভা-সমাবেশের অনুমতি না দেয়ার জন্য সরকারের কাছে লিখিত আবেদন জানানো হয়। গতকাল সোনালী ব্যাংকের সিবিএর পক্ষ থেকেও একই দাবি জানানো হয়।
গতকাল ব্যাংকপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়কের দুই পাশের খুব কম ভবনই অক্ষত। সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ। হেফাজতের ক্রোধে পুড়ে গেছে জনতা ব্যাংকের পুরানা পল্টন শাখা। ফলে গতকাল এ শাখায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। মতিঝিল ব্যাংকপাড়া ছিল এক রকম ফাঁকা।
এছাড়া ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ভবন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, সিটি সেন্টার ভবনের গ্রামীণফোন কাস্টমার কেয়ার, বায়তুল ভিউ টাওয়ার, হোটেল মধুমতি, আজাদ প্রডাক্টসে হামলা চালান হেফাজতের কর্মীরা।
এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে মাহমুদ সাত্তার বলেন, ‘এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক অস্থিরতা চলছে। এখানে প্রতিষ্ঠান তো বটেই, মানুষের জীবনেরই নিশ্চয়তা নেই।
আক্রমণ তো শুধু মতিঝিল নয়, গুলশান, রামপুরা, বাড্ডা— সব জায়গায় হচ্ছে। এখন এটিএম বুথে আক্রমণ চলছে; দুই দিন পর হয়তো বুথ ভেঙে টাকা নিয়ে যাবে। ফলে নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করছে। এ অবস্থায় পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি নিজেরা নিরাপত্তা বাড়াচ্ছি।’
এদিকে ব্যাংকে ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে মতিঝিল ও দিলকুশাকে সভা ও সমাবেশমুক্ত এলাকা ঘোষণার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, গতকাল দিল্লি থেকে ফিরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ মতিঝিল এলাকার সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মতিঝিল এলাকাকে সমাবেশমুক্ত রাখার বিষয়ে অর্থ সচিবের সঙ্গে পরামর্শ করেন। বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
এদিকে ব্যাংকপাড়ার নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব রিজওয়ানুল হুদা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, মতিঝিল শাপলা চত্বরে একটি সংগঠনের সমাবেশ চলাকালে মতিঝিল ও এর আশপাশে ব্যাপক গোলযোগ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির একটি বিবরণী অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য চিঠিতে অনুরোধ করা হয়।
এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদউদ্দিন বলেন, মতিঝিল এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা জরুরি। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র মতিঝিল। শাপলা চত্বরে সমাবেশ চললে ব্যাংকগুলো নিরাপত্তাহীন থাকে। গত রোববার হেফাজতের হামলায় ব্যাংকপাড়ার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্টরা। সরকার ভবিষ্যতে এ এলাকায় সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করলে তিনিসহ সব ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী তা স্বাগত জানাবেন।
Discussion about this post