ঋণ পরিশোধের এক অভিনব প্রস্তাব দিয়ে আবারো আলোচনায় এসেছে বেক্সিমকো গ্রুপ। গ্রুপটির টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা ৫ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা পরিশোধে ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের কাছে এক প্রস্তাব পাঠিয়েছেন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান। প্রস্তাবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি কিস্তি পরিশোধে আড়াই বছর স্থগিতাদেশ এবং ঋণের সুদ ১০ শতাংশ নির্ধারণের আবেদন করেছে তারা।
বেক্সিমকো গ্রুপের পাঠানো প্রস্তাবের ওপর মতামত চেয়ে ১৯ আগস্ট ৭ ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা, ন্যাশনাল, এক্সিম ও এবি ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের কাছে তাদের দেনা ৪ হাজার ৩১৫ কোটি ও বেসরকারি তিন ব্যাংকের কাছে ৯২৯ কোটি টাকা। গতকাল পর্যন্তও এসব ব্যাংক প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে সালমান এফ রহমান এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে।
সালমান এফ রহমান স্বাক্ষরিত দুই পৃষ্ঠার ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বেক্সিমকো গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো টেক্সটাইল বেসরকারি খাতের অন্যতম পুরনো এবং বড় একটি প্রতিষ্ঠান। টেক্সটাইল খাতের পাশাপাশি ওষুধ, সিরামিক ও পাট সুতা খাতে এ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি এসব পণ্য বিভিন্ন দেশে রফতানিও হয়। দুই হাজারের বেশি দক্ষ পেশাজীবীদের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার কর্মী। পরিবেশনা, সরবরাহ ও সেবা প্রদান সংশ্লিষ্ট কাজে অপ্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে আরো দুই লাখ মানুষ। ব্যবসা পরিচালনায় করপোরেট সংস্কৃতি প্রবর্তনে এ গ্রুপের সুনাম রয়েছে।
দেশে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ প্রতিষ্ঠায় এ গ্রুপের টেক্সটাইল বিভাগের অবদান স্বীকৃত। ফলে অধিক মূল্য সংযোজিত তৈরি পোশাক রফতানি সম্ভব হচ্ছে এবং অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখছে। গত ১০ বছরে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য রফতানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এতে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ গ্রহণে বাধা দেয়ার পাশাপাশি নানাভাবে তাদের হয়রানি করা হয়। ফলে গ্রুপটিকে মাঝে মধ্যেই চলতি মূলধন সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। তবে তা কোম্পানির নগদ অর্থপ্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যের বিচারে যতটা করা হয়েছে, তার চেয়ে খেলাপি তকমা থেকে রেহাই পেতেই করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আয় ও কিস্তি পরিশোধের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে।
গত তিন বছরে গ্রুপটি বিভিন্ন ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে। এটা গ্রুপের চলতি মূলধনের ওপর ব্যাপক চাপ ফেলেছে এবং বেক্সিমকো লিমিটেড চরম তারল্য সংকটে ভুগছে ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। টিকে থাকার জন্য এর ঋণের যথাযথ পুনর্গঠন প্রয়োজন। এ কাজে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস প্রতিষ্ঠান এসএফ আহমেদ অ্যান্ড কোংকে একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়, যে পরিকল্পনা আপনার কাছে পেশ করছি। এ পরিকল্পনার মূল সুপারিশগুলো হচ্ছে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আমাদের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস বিভাগের সব ঋণের স্থিতি একীভূত করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিশোধের জন্য পুনঃতফসিলীকরণ। কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আড়াই বছরের জন্য স্থগিত করা এবং সুদের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে ওই প্রস্তাবে বলা হয়, ঋণের বিদ্যমান শর্ত বহাল থাকলে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস বিভাগ খেলাপি হয়ে পড়বে। যদি প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়, তাহলে খেলাপি থেকে রক্ষা মিলবে ও দেনাও শোধ করা যাবে।
প্রস্তাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আহ্বান জানানো হয়, তারা (বাংলাদেশ ব্যাংক) যেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সুপারিশ করে তাদের এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
বেক্সিমকোর প্রস্তাব পেয়ে ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাতটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেক্সিমকো গ্রুপের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রস্তাবের আলোকে আপনাদের মতামত ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে প্রেরণের অনুরোধ করা হলো। তবে বিষয়টি নিয়ে বণিক বার্তার
কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
Discussion about this post