বিকাশের গ্রাহকেরা শিগগিরই দি সিটি ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো বন্ধক বা জামানত ছাড়াই ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন—এমন খবরে অনেকেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন। গ্রাহকদের তাৎক্ষণিকভাবেই পাওয়ার কথা ডিজিটাল ঋণ নামে পরিচিত এই অতিক্ষুদ্র ঋণ। কারণ, বিকাশের গ্রাহকদের কোনো ধরনের নথিপত্র জমা না দিয়েই এটি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার বছরে ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়াতেই সিটি ব্যাংকের অতিক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের উদ্যোগটি আটকে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের জুলাইয়ে সিটি ব্যাংককে পরীক্ষামূলকভাবে বিকাশের গ্রাহকদের ঋণ প্রদানের অনুমতি দেয়। ওই সময় বিকাশের ৩৫ হাজার গ্রাহককে ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয় সিটি ব্যাংক। এসব ঋণের সুদহার ছিল বছরে ৯ শতাংশ ও ঋণের মাশুল ছিল ২ শতাংশ। এভাবে প্রায় ৭ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকটি। গ্রাহকেরা প্রত্যেকে গড়ে দেড় হাজার টাকা ঋণ নেন। এসব ঋণের প্রায় ৯৬ শতাংশ ফেরত আসে। খেলাপি হয় মাত্র ৪ শতাংশ।
নতুন সেবাটি সম্পর্কে সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিকাশের লেনদেন প্রতিবেদন ও ব্যবহারের ধরন দেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই ঠিক করে দেয়, গ্রাহক ঋণ পাওয়ার যোগ্য কি না। অতিক্ষুদ্র এই ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে সিটি ব্যাংক ঋণ দেয়। এ জন্য কোনো নথিপত্র জমা দিতে হয় না। শুধু বিকাশ অ্যাপে ক্লিক করে ঋণের জন্য আবেদন করতে হয়। এরপর আবেদনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পর্যালোচনায় উত্তীর্ণ হলে মুহূর্তেই ঋণের টাকা চলে যায় গ্রাহকের বিকাশ হিসাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে সিটি ব্যাংককে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই অতিক্ষুদ্র ঋণ চালুর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। তবে শর্ত জুড়ে দিয়েছে যে ঋণের আকার সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা, বার্ষিক সুদহার ৯ শতাংশ এবং প্রসেসিং ফি বা মাশুল দশমিক ৫ শতাংশ হতে হবে। এতেই বিপত্তি ঘটেছে, ঋণ বিতরণের উদ্যোগটি আটকে গেছে। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ ও মাশুল সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে রাখতে বলেছে; আর সিটি ব্যাংক ১১-১২ শতাংশ পেতে চায়।
সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এমন শর্তে এই সেবা চালু করলে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হবে। এখন ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার ঋণের সুদহার ২৪ থেকে ৩২ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সুদও ২০ শতাংশ। বিকাশের যেসব গ্রাহককে ঋণ দেওয়া হবে, তাঁদের কেউই চেনাজানা নন। তাই ঋণের ঝুঁকিও অনেক বেশি। এ জন্য সুদহার না বাড়ালে এই সেবা চালু করা সম্ভব নয়।
জানা গেছে, প্রতিবেশী ভারতসহ চীন, ফিলিপাইন, কেনিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশে এমন ডিজিটাল ঋণ ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অন্য পেশাজীবীরাও নতুন এই ডিজিটাল ঋণ নিতে পারেন।
দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিকাশের গ্রাহকদের পরীক্ষামূলকভাবে ন্যানো ঋণ দিয়ে আমরা সফল হয়েছি। এতেই বোঝা যায়, ক্ষুদ্র গ্রাহকেরা ঋণ পেলে নিয়মিত পরিশোধ করবেন। তবে ন্যানো ঋণের সুদের হারের যে শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তাতে কবে নাগাদ এই সেবা চালু করা যাবে, তা বলা মুশকিল।’
মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, ‘আমরা এই সেবা থেকে মুনাফা করতে চাই না। যাঁদের ছোট অঙ্কের তাৎক্ষণিক ঋণ প্রয়োজন, তাঁদের কাছে ঋণ পৌঁছে দিতে চাই।’
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা বলছেন, নতুন সেবাটির মাধ্যমে দেশে প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে প্রবেশের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কারণ, এখন পর্যন্ত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু হিসাব খোলা ও টাকা জমা দেওয়ার মধ্যেই সীমিত রয়ে গেছে। আর মোবাইল ব্যাংকিংয়েও তা শুধু হিসাব খোলা ও অর্থ স্থানান্তরেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া অতিক্ষুদ্র ঋণের জন্য প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের এখনো চড়া সুদের ঋণের জন্য মহাজন ও এনজিওদের কাছে ছুটতে হচ্ছে।
সিটি ব্যাংকের সেবাটি চালু হলে রিকশাওয়ালাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র গ্রাহক তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পাওয়ার জন্য যে হয়রানির মুখে পড়েন, সেটির অবসান ঘটত। অর্থাৎ হাতে থাকা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিকাশ হিসাব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এ রকম ছোট অঙ্কের ঋণ পেয়ে যেতেন।
সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সেবাটি চালু হলে শুধু রিকশাচালক নন, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী, যেকোনো শ্রেণির উপযুক্ত গ্রাহকেরা এমন ঋণ পেতেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে অতি ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের যুগে প্রবেশ করত। যাহোক, বিকাশ দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। আর সিটি ব্যাংক প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার অগ্রদূত। এই দুই প্রতিষ্ঠান মিলে সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষুদ্রঋণ পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা।
Discussion about this post