
বিপুল অঙ্কের ব্যাংকঋণ নিয়ে চট্টগ্রামের বড় অনেক প্রতিষ্ঠানই তা সময়মতো পরিশোধ করছে না। কোনো কোনো ব্যবসায়ী এক খাতের ঋণ স্থানান্তর করেছেন অন্য খাতে। আবার কেউ কেউ ব্যবসাই গুটিয়ে বসে আছেন। এসব ঘটনা ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণ অনুমোদনে আস্থা পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, নীতিমালা পরিবর্তনে জাহাজ ভাঙাশিল্পে মন্দা ও বছরজুড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ দেয়া বন্ধ থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে তাই চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ীই ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারেননি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রমতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই রয়েছে মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স (এমইবি), ইমাম গ্রুপ অব কোম্পানিজ, সিদ্দিক ট্রেডার্স, পিএইচপি, আবুল খায়ের, এস আলম, কেএসআরএম, বায়েজিদ স্টিল, নূরজাহান ও মোস্তফা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। তাদের কারো কারো কাছে একাধিক ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার বেশি লগ্নি রয়েছে। আবার কয়েকটি ব্যাংক সিন্ডিকেট করেও কোনো কোনো গ্রুপকে বড় অঙ্কের অর্থায়ন করেছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহীম বলেন, গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটের কারণে জাহাজ ভাঙাশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি দেশে উন্নয়নকাজ তেমন একটা নেই। ফলে রডের চাহিদাও কমে গেছে। একই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দাসহ ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক দফা। এ সবকিছুর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যে। ফলে অনেকেই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি।
জানা গেছে, শুধু ভোগ্যপণ্যেই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে সোনালী ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ এলটিআর ও সিসি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস ভঙ্গ করায় এর পুরোটাই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এ ঘটনায় প্রায় দেড় ডজন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ব্যাংকটি।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ী কথা দিয়ে ঋণ শোধ করেননি। ফলে তা খেলাপি হয়ে গেছে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এখন আবার অনেকে ডাউন পেমেন্ট দিয়ে পুনঃতফসিল করার জন্য এগিয়ে আসছেন।
এদিকে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলেও তা পরিশোধ করছে না চট্টগ্রামের ইমাম গ্রুপ অব কোম্পানিজ। প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড থেকে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ১১০ কোটি, সোনালী ব্যাংক থেকে ১০০, এক্সিম ব্যাংক থেকে ৫৬ ও আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে মোহাম্মদ আলীর মালিকানাধীন ইমাম গ্রুপ। একইভাবে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, যমুনা, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, প্রিমিয়ার ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকেও। বছরের পর বছর অনাদায়ী পড়ে আছে এ ঋণ। ঋণ পরিশোধের তাগাদা দিয়েও কাজ না হওয়ায় আইনের আশ্রয় নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এরই মধ্যে ১০০-এর মতো মামলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকিং খাতে এ সংকট সৃষ্টি করেছে চট্টগ্রামের আরেক শিল্প গ্রুপ মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স (এমইবি)। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) হিসাবে, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিষ্ঠানটির দেনার পরিমাণ ১ হাজার ২২ কোটি টাকা। এক বছর আগেও যা ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এরই মধ্যে গ্রুপটির মালিকানা নিয়ে পারিবারিক বিরোধও দেখা দিয়েছে। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে শিল্প গ্রুপটি। সব মিলিয়ে কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানই নতুন করে ইলিয়াস ব্রাদার্সের নামে ঋণ অনুমোদন করছে না।
চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী এমন পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের অস্থিরতার কারণে অনেকেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। এছাড়া ঋণের অর্থ অন্য খাতে অর্থ সরিয়ে নেয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তাও অস্বীকার করা যাবে না। সব মিলিয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’
চট্টগ্রামের আরেক শিল্প ও বাণিজ্য গ্রুপ সিদ্দিক ট্রেডার্সের কাছে সরকারি-বেসরকারি ১৭টি ব্যাংকের অনাদায়ী পড়ে আছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিনেও এ টাকা বুঝে না পাওয়ায় আইনের আশ্রয় নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। একের পর এক মামলার জালে জড়িয়ে পড়ছে ‘সিদ্দিক’ ব্র্যান্ডের ছাতা বিক্রি করে দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি। সিদ্দিক ট্রেডার্সের কাছে অগ্রণী ব্যাংকের পাওনা ১৫০ কোটি টাকার বেশি, ব্র্যাক ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১০০ কোটি ও যমুনা ব্যাংকের ৮০ কোটি টাকা। একইভাবে ন্যাশনাল ব্যাংক, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড, আল-আরাফাহ ইসলামীসহ আরো কয়েকটি ব্যাংকের পাওনা সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার বেশি। এসব ঘটনায় সর্বশেষ গত বছরের ১২ আগস্ট সিদ্দিক ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে মামলা করে যমুনা ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা। এতে ৫০ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
এ প্রসঙ্গে সিদ্দিক ট্রেডার্সের কর্ণধার আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘গত বছর দেড় হাজার কোটি টাকার ভোগ্যপণ্য আমদানি করি। কিন্তু বাজারে দাম পড়ে যাওয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এ কারণে ঋণ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। গত বছরের মার্চে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশে আমাদের সব ব্যাংক হিসাবে লেনদেন স্থগিত করে দেয়া হয়েছে। এতে সমস্যা আরো বেড়ে গেছে।’
প্রতিটি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে সম্পদ বন্ধক রয়েছে দাবি করে আবু সাঈদ চৌধুরী আরো বলেন, ‘জায়াগা-জমি বিক্রি করে আমরা ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করছি। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সব দেনা পরিশোধ করে দেব।’
সময়মতো ব্যাংকঋণ শোধ করতে পারছে না চট্টগ্রামে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। খাতুনগঞ্জের অন্যতম আমদানিকারক এ জামান ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী নুরুল আলম বলেন, ‘ডাল আমদানি খরচ প্রতি কেজিতে ৭২ টাকা পড়লেও এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০ টাকায়। আমার নিজের এ ধরনের ৮০০ টন ডাল এখনো গুদামে পড়ে আছে। এ কারণে অনেকেই বেকায়দায় পড়েছেন। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা দুর্নামের ভাগীদার হয়েছেন।’
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার এ বিষয়ে বলেন, চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙাশিল্প ও ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাংকের বড় অঙ্কের অর্থ আটকে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে খেলাপি ঋণে।
Discussion about this post