খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন (সঞ্চিতি) সংরক্ষণের জন্য বাড়তি সময় পাচ্ছে ব্যাংকগুলো। এ হিসাবে ডিসেম্বরভিত্তিক খেলাপি ঋণের বিপরীতে মার্চ বা জুন ভিত্তিতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা যাবে। ডজনখানেক ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একটি ব্যাংক এরই মধ্যে এ সুবিধা পেয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোর আবেদনও বিবেচনাধীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, বিভিন্ন বিষয় বিচার-বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোকে এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এর আগে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের প্রভিশনিংয়ের ক্ষেত্রেও একই সুবিধা দেয়া হয়েছে। এটা ছাড় দেয়া নয়, বরং কিছুটা সময় দেয়া। পরে তাদের অবশ্যই প্রভিশনিং করতে হবে। এ সুযোগ না দিলে কিছু ব্যাংকের মুনাফায় বড় প্রভাব পড়বে, ফলে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হবে।
জানা গেছে, গত বছর ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ে জানুয়ারিতে কাজ শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরিদর্শনে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর নানা কৌশল বেরিয়ে আসতে থাকে। সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বছর শেষে ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। নিয়ম হলো, এ খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সঞ্চিতি রাখা। কিন্তু কিছু ব্যাংক সে হারে সঞ্চিতি না রেখেই আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির প্রস্তুতি নেয়। ফলে সঞ্চিতি ঘাটতি থেকেই যায়। আর কোনো ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি থাকলে তাকে চূড়ান্ত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির অনুমতি দেয় না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুনাফা ঘোষণার পাশাপাশি বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজনেরও অনুমতি পায় না ওই ব্যাংক।
এ থেকে রক্ষা পেতেই ব্যাংকগুলো এখন ডিসেম্বরের খেলাপির সঞ্চিতি মার্চ বা জুনে সংরক্ষণের অনুমতি চাইছে। এরই মধ্যে ডজনখানেক ব্যাংক এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করেছে। প্রাইম ব্যাংক ৪০০ কোটি টাকা মার্চ ও জুন ভিত্তিতে সঞ্চিতি করার অনুমতিও পেয়েছে।
জানা গেছে, বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংককে বিসমিল্লাহ গ্রুপের খেলাপি ঋণের ৩০৬ কোটি টাকা মার্চ ভিত্তিতে প্রভিশনিং করার অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস বিভাগ। ব্যাংকের জুবিলি রোড শাখার এসএ স্পিনিং, মা করপোরেশন ও এমএম করপোরেশনের আটটি হিসাবের ৯৪ কোটি টাকা সঞ্চিতি ঘাটতি জুন ভিত্তিতে সংরক্ষণ করার অনুমতি দেয় ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ। গত বছর ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয় ২৬৮ কোটি টাকা। যদিও ৪০০ কোটি টাকা ডিসেম্বর ভিত্তিতে প্রভিশনিং করতে হলে ব্যাংকটির ১৩২ কোটি টাকা লোকসান হতো।
একইভাবে শাহজালাল ব্যাংকও ১১২ কোটি টাকা পরে প্রভিশনিং করার অনুমতি চেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অনুমতি দিতে যাচ্ছে। ব্যাংকটি গত বছর নিট মুনাফা করেছে ১৮০ কোটি টাকা, ১১২ কোটি সঞ্চিতি করতে হলে মুনাফা নেমে আসত ৬৮ কোটি টাকায়।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রহমান সরকার বলেন, ‘আমাদের কিছু বিল ও ফোর্সড ঋণের প্রভিশনিং পরবর্তীতে করতে চাই। আমরা অন্য ব্যাংক থেকে বিল কিনেছি, তাদের তো আর খেলাপি করা যায় না। আর সোনালী ব্যাংক আমাদের পাওনা বিল কেন দিচ্ছে না, এখনো তা পরিষ্কার নয়।’
জানা গেছে, বিভিন্ন শাখায় অনিয়মের ঘটনায় খেলাপি হওয়া এনসিসি ব্যাংক ১৭৬ কোটি টাকা পরে প্রভিশনিং করার অনুমতি চেয়েছে। গত বছর ব্যাংকটি ১৪০ কোটি টাকা মুনাফা করে। কিন্তু ১৭৬ কোটি টাকা প্রভিশনিং করলে ৩৬ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হতো ব্যাংকটিকে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৭৬ কোটি টাকা পরে প্রভিশনিং করার অনুমতি চেয়েছে। গত বছর ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয় ৩৩ কোটি টাকা। ৭৬ কোটি টাকা সঞ্চিতি করতে হলে ব্যাংকটির ৪৩ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হতো। এছাড়া যমুনা ব্যাংক ৭৪ কোটি এবং ওয়ান ব্যাংক ৪১ কোটি টাকা পরে প্রভিশনিংয়ের অনুমতি চেয়েছে। একই অনুমতি চেয়েছে পূবালী, ডাচ্-বাংলা, এবি ব্যাংকও।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রেসিডেন্ট আল মারুফ খান বলেন, নিয়ম হলো, যেখন শ্রেণীবিন্যাস করা হবে, একই সঙ্গে প্রভিশনিংও করতে হবে। তবে আর্থিক খাতের ওপর চাপ পড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন সুযোগ দিয়েছে। এটা সাময়িক সহায়তা হতে পারে। এখনই ব্যাংকগুলোর ঋণমান উন্নত করতে না পারলে এটা কোনো কাজে আসবে না। চলতি বছর স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্ক প্রভিশনিং করতে হবে। এর ওপর রয়েছে গত বছরের প্রভিশনিং। সব মিলিয়ে ২০১৩ সালে খাতটির ওপর চাপ তৈরি হবে।
Discussion about this post