ব্যাংকিং খাতে তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৮ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ২০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের এ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জানা গেছে, মুনাফার পাল্লা ভারী করতেই ব্যাংকগুলো এর আগে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ গোপন রাখত। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির কারণে এখন তা করতে পারছে না। এ কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
সাধারণত খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন বা সঞ্চিতি রাখতে হয়। এটা করা হলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়। কারণ প্রভিশন বা সঞ্চিতি রাখতে হয় মুনাফা থেকে। ব্যাংকগুলো মুনাফা বাড়াতে বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে তা হালনাগাদ করে। তাই খেলাপি ঋণ কমে যায়। খেলাপি ঋণ কমে গেলে ব্যাংককে প্রভিশনও কম করতে হয়। তখন ব্যাংকের মুনাফার অঙ্ক বড় হয়। সম্প্রতি আটটি ব্যাংকে এ প্রক্রিয়ায় খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রমাণও পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে খেলাপি ঋণ কম দেখানোকে ব্যাংকিং ভাষায় উইন্ডো ড্রেসিং বলে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরে নতুন নীতিমালা প্রয়োগ করার কারণে অনেক ব্যাংকই খেলাপি ঋণ কম দেখিয়েছেন। এছাড়া মার্চে অনেকেই খেলাপি হয়ে গেছেন। ফলে মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এত বেড়ে গেছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতার কারণেই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতা নির্বাচনেই ভুল করে। দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো, অদক্ষতা প্রভৃতি বিষয় এক্ষেত্রে কাজ করে। তিনি বলেন, ঋণখেলাপিরা অর্থঋণ আদালতের আশ্রয় নেন এবং আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে পার পেয়ে যান। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে সুদ হার কমছে না। মূলত আইন, ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দুর্বলতাই খেলাপি ঋণ বাড়ার জন্য দায়ী।
জানা গেছে, ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি। গত মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ, যার পরিমাণ ৫১ হাজার ২০ কোটি।
মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ বা ২১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা।
বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ বা ১৩ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। বিদেশী ব্যাংকগুলোর মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ হয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। ডিসেম্বরে যা ছিল ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ বা ৮৪৫ কোটি টাকা।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে ৭ হাজার ৬৭৮ কোটি, যা বিতরণ করা ঋণের ২৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ বা ৭ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
Discussion about this post