প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে প্রাইম ব্যাংক। তিন মাসের ব্যবধানে দেশের প্রথম সারির এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণও বেড়েছে ৬৮১ কোটি টাকা। বিসমিল্লাহ গ্রুপের অর্থ কেলেঙ্কারি ও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানটিকে এ অবস্থায় ফেলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ১৫ বছর ধরে প্রাইম ব্যাংক দেশের বেসরকারি খাতে শীর্ষ ব্যাংকগুলোর সারিতে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিংয়েও গত বছর তার অবস্থান ছিল শক্তিশালী। তবে বর্তমানে সে অবস্থার অবনতি হয়েছে।
শুরু থেকেই বড় আকারে করপোরেট অর্থায়ন করে প্রাইম ব্যাংক। সে কারণে ব্যাংকটি এ খাতে সুনামও অর্জন করে। কিন্তু গত বছর কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতার অনিয়ম ধরা পড়ার পর প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি বেরিয়ে আসে।
এসব প্রসঙ্গে প্রাইম ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকটি একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। অর্থনীতিতে মন্দার পাশাপাশি ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার কারণেও এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিষয়ের তদন্ত হচ্ছে। পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। নতুন পর্ষদ ব্যাংকটির সম্পদ ও গুণগত মান আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়। এজন্য আমরা নতুন করে এসএমই ও রিটেইল প্রডাক্টের দিকে বেশি নজর দিচ্ছি।’
জানা গেছে, গত মার্চ শেষে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা; ডিসেম্বরে যা ছিল ৪৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬৮১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে মোট ঋণের ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ খেলাপি হলেও মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬১ শতাংশে। মার্চে ৭০৩ কোটি টাকা প্রভিশনিং রাখার প্রয়োজন হলেও ব্যাংকটি সংরক্ষণ করে ৪৫১ কোটি টাকা। ফলে মার্চ শেষে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ২৫১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
প্রাইম ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ হাতিয়ে নেয় ৭৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫১ কোটি মন্দ মানে পরিণত হয়েছে; যার পুরোটাই প্রভিশনিং করতে হয়েছে। আবার ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে কর্মকর্তারা তা নিজস্ব হিসাবে স্থানান্তর করেন। এ ঘটনায় ৪৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে আত্মসাত্কৃত এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২২ কোটি টাকা। এরও প্রভিশনিং করতে হয়। এসব ঘটনা ব্যাংকের সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব ফেলে; যা দৃশ্যমান হয় মার্চভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদনে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান খসরু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিসমিল্লাহ গ্রুপের ক্ষতির পুরোটাই প্রভিশন করা হয়েছে। এ কারণে খেলাপি বেড়েছে আর প্রভিশন ঘাটতি রয়ে গেছে। শিগগিরই এসব ঋণ অবলোপন করা হবে। জুনে না হলেও সেপ্টেম্বরে সব ঠিক হয়ে আসবে। আমাদের আর্থিক প্রতিবেদন এখনো শক্তিশালী।’
ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমন মন্তব্য করলেও গত এক বছরে প্রাইম ব্যাংকের মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় তিন ডজন কর্মকর্তাকে এরই মধ্যে অর্থ আত্মসাতের কারণে দুদকে হাজিরা দিতে হয়েছে। অচিরেই এদের অনেকের বিরুদ্ধে করা মামলার চার্জশিট তৈরি হবে।
এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান জানান, প্রাইম ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগটি দুদকের নিজস্ব গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষও একই অভিযোগে মামলা করে। অর্থ আত্মসাতে যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
Discussion about this post