
ঘটনাপরম্পরায় আজ তার উভয় দিকই উন্মোচিত। এনায়েতুর রহমান বাপ্পী গত এক দশকে গণমাধ্যমের উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেলেও অতীত ও বর্তমান ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে অহিনকুল সম্পর্ক। ব্যাংকে দেনা রয়েছে কোটি কোটি টাকা। হালে খেলাপি ঋণের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০০ কোটি টাকার ওপর। ক্ষমতাসীন বড় বড় ব্যক্তির ফোন কলে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ দিয়ে এখন বেকায়দায় রূপালী, ইসলামী ও এবি ব্যাংক।
ব্যবসায়িক সুবিধা নিতে বিএনপি আমলে মোসাদ্দেক আলী ফালু ও হাওয়া ভবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রেখেছেন এনায়েতুর রহমান। এখন আবার তার ব্যবসায়িক অংশীদার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের ভাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম। বিভিন্ন সময় ক্ষমতাবানরা তার সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে সংশ্লিষ্ট হলেও দ্বিচারিতার কারণে পরবর্তী সময়ে সরে এসেছেন।
চ্যানেল নাইনের মালিক প্রতিষ্ঠান ভার্গো মিডিয়ার নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে ব্যয়ের অস্বচ্ছতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমান ও উদ্যোক্তা সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলামের সঙ্গে বর্তমানে চরম অনাস্থার সম্পর্ক বিরাজ করছে। উভয়ের দ্বন্দ্বের সূত্রে এনায়েতুর রহমানের দেশ ত্যাগের ওপরও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে এনায়েতুর রহমান ও সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি।
বিল্ডট্রেড: অনুসন্ধানে জানা যায়, এনায়েতুর রহমানের বিশ্বাস ভঙ্গের সূত্রপাত বিল্ডট্রেডের মাধ্যমেই। প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ একজন জানান, বেক্সিমকো শিল্প পার্কের মাটি ভড়াটের কাজ করার সুবাদে প্রকল্প পরিচালক বিল্ডট্রেডের মূল উদ্যোক্তা প্রয়াত আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এনায়েতুর রহমানের। ১৯৯৯ সালে বিপণন বিভাগের আর্থিক হিসাব বুঝিয়ে না দিতে পারায় তাকে এটিএন বাংলা ছাড়তে হয়। প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর এনায়েতুর রহমান বিল্ডট্রেডের পরিচালক পদ নেন। কিন্তু আশরাফুল ইসলাম মারা যাওয়ার পর মোসাদ্দেক আলী ফালুও বিল্ডট্রেডের সঙ্গে যুক্ত হন। তারপর নতুন পরিচালকদের চাপে প্রতিষ্ঠানে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন আশরাফুল ইসলামের নিকটাত্মীয় উদ্যোক্তা পরিচালক জাকির হোসেন সরকার। একপর্যায়ে তাকে কোম্পানি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
নিজের প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সরকার স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘নিজের হাতে গড়া কোম্পানি আমাকে কৌশলে ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ব্যবসায়িকভাবেও আমি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’
শুধু জাকির হোসেন সরকার নন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনে একসময় মোসাদ্দেক আলী ফালুও বিল্ডট্রেড গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন। প্রতিষ্ঠানটির নামে নেয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন মেয়াদোত্তীর্ণ।
সর্বশেষ হিসাবে, বিল্ডট্রেডের ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। নয়টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এসব ঋণের প্রায় অর্ধেকই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
জানা গেছে, এবি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় বিল্ডট্রেড গ্রুপের বর্তমান দায় ২৭৫ কোটি টাকা। যদিও গ্রুপটির ঋণসীমা রয়েছে ২৪৫ কোটি টাকা। এরই মধ্যে ৭১ কোটি টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আর ২৮ কোটি টাকা সাব-স্ট্যান্ডার্ড অর্থাত্ বিরূপ মানে শ্রেণীকৃত হয়েছে। বর্তমানে গ্রুপটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে যে পরিমাণ অর্থ পাবে, তা দিয়ে এ ব্যাংকের ঋণ শোধ সম্ভব নয় বলে ব্যাংকের পর্ষদ সভায় আলোচনা হয়েছে।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় বিল্ডট্রেড কালার কোডের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সময়মতো কিস্তি শোধ না হওয়ায় ৬ কোটি টাকা সাব-স্ট্যান্ডার্ড অর্থাত্ বিরূপ মানে শ্রেণীকৃত হয়েছে। ব্যাংক এশিয়ার স্কশিয়া শাখায় থাকা ৪৬ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে ৮ কোটি ৬৭ লাখ একই মানে শ্রেণীকৃত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
চ্যানেল নাইন: ২০১০ সালের ২৯ মার্চ চ্যানেল নাইনের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান ভার্গো মিডিয়া লিমিটেড প্রতিষ্ঠা হয়। এর অধীনেই ২০১১ সালের ৮ এপ্রিল চ্যানেল নাইন যাত্রা করে। শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটিতে ১৩ হাজার শেয়ারের মধ্যে ১০ হাজার ছিল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ভাই সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম ও তার স্ত্রী সৈয়দা মাহবুবা আক্তারের। কিন্তু ২০১১ সালের ১৭ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ শতাংশ শেয়ার স্থানান্তর হয় এনায়েতুর রহমানের কাছে। তিনি বিল্ডট্রেড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষে ৫ হাজার ৮৫০ শেয়ার নেন। এছাড়া তার স্ত্রী সাবিনা রহমান কোম্পানির আরো ২০ শতাংশ শেয়ার নেন; যার পরিমাণ ২ হাজার ৬০০ শেয়ার। এর মাধ্যমেই চ্যানেল নাইনে এনায়েতুর রহমানের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়। ২০১২ সালের ১ নভেম্বর সাবিনা রহমান তার স্বামীকে পুরো শেয়ার স্থানান্তর করেন। ফলে কোম্পানিতে এনায়েতুর রহমানের শেয়ার দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশে। কোনো প্রকার নিজস্ব বড় বিনিয়োগ ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মালিক হয়ে যান তিনি।
অন্যদিকে শাফায়েতুল ইসলাম ক্রমেই চ্যানেলটিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এমনকি বসুন্ধরা সিটি থেকে দফতর স্থানান্তরের সময় তাকে যথাযথভাবে অবহিতও করা হয়নি। অথচ তার নাম ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে ভার্গো মিডিয়ার নামে রূপালী ব্যাংকে ঋণস্থিতি শতকোটি টাকার ঊর্ধ্বে। এ ঋণও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ উদ্দিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ মালিকানা পরিবর্তন যা-ই হোক, এখন তার দায় পড়বে যিনি প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক। প্রতিষ্ঠানটির কিস্তি পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। তবে ঋণটি নিয়মিত করার জন্য ২৮ মে ৪ কোটি টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
এদিকে ‘বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনা নীতি, ১৯৯৮’-এর ধারা ২(৮) অনুযায়ী মালিকানা বা অংশীদারিত্ব হস্তান্তরের আগে সরকারের অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে চ্যানেল নাইনের শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অনুমোদন নেয়া হয়নি বলে জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আমাদের কাছে অভিযোগটি এসেছে। এর তদন্তও চলছে। দোষী প্রমাণিত হলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
গেমঅন স্পোর্টস: অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গেমঅন স্পোর্টস। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানও এনায়েতুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটির কাছে গত আসরের পাওনা ১৯ কোটি টাকা এখনো আদায় করতে পারেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পাওয়া যায়নি আগামী আসরের ব্যাংক গ্যারান্টিও।
বিসিবির সদস্য ও বিপিএলের গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আফজালুর রহমান সিনহা গতকাল সন্ধ্যায় নিশ্চিত করেন, গেমঅন স্পোর্টস তাদের পাওনা অর্থ দেয়নি।
বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের আরেক সদস্য জানান, ২০ মে এ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তাদের অসুবিধা থাকায় গতকাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়; কিন্তু গতকালও ব্যাংক গ্যারান্টি পাওয়া যায়নি। গ্যারান্টি এ মাসে পেলেও কবে নাগাদ ক্যাশ হবে, তা স্পষ্ট করতে পারেননি বিপিএল-সংশ্লিষ্ট এ কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে গেমঅন স্পোর্টসের চেয়ারম্যান এনায়েতুর রহমান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ব্যাংক গ্যারান্টির কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের অনুসন্ধান শেষে গতকাল তা বিসিবির কাছে পৌঁছানোর কথা থাকলেও হরতালের কারণে তা হয়নি। আশা করি, এ সপ্তাহে ব্যাংক গ্যারান্টি বিসিবির হাতে পৌঁছবে।’
তবে গেমঅন স্পোর্টস নিয়ে কথা বললেও অন্য প্রসঙ্গগুলো নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাকে লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও চ্যানেল নাইন ও বিল্ডট্রেড-সংক্রান্ত আর্থিক ও মালিকানা জটিলতা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
Discussion about this post