রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অধোগতি রাজস্ব ও আর্থিক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে দরকার পুনঃঅর্থায়ন ও কঠোর তদারকি। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন দিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বর্ধিত ঋণ সুবিধার (ইসিএফ) আওতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে দ্বিতীয় পর্যালোচনাটি গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়।
আইএমএফ বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের নন-পারফর্মিং ঋণ বেড়ে গড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যাংকগুলোর এ খারাপ অবস্থাই মূলত রাজস্ব ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর্থিক ঝুঁকি কমিয়ে আনতে চার ব্যাংকের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার; যেখানে ঋণ প্রবৃদ্ধি, আদায় ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বিষয় নির্দিষ্ট আছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে তিনটি ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ সংক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে।
জানা গেছে, আইএমএফকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চলতি বছরের জুনের ভিত্তিতে চার ব্যাংকের ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা শুরুর কথা রয়েছে; যেখানে ব্যাংকের সম্পদ মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য সেপ্টেম্বরের সমঝোতা স্মারকে প্রতিফলিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের ডিসেম্বর ভিত্তিতে ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করলেও তার ফল এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উন্নয়নে চার ব্যাংককে জিডিপির দেড় শতাংশ পুনরায় মূলধন হিসেবে বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করেছে আইএমএফ। এক্ষেত্রে চার ব্যাংকের আর্থিক কার্যক্রম উন্নত করতে সমঝোতা স্মারক কঠোরভাবে মেনে চলা ও ঋণ বিতরণে সামগ্রিক বিচক্ষণতাসহ মন্দ ঋণ আদায়ে আগ্রাসী হওয়ার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে আইএমএফের বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত। শুধু এসব ব্যাংকে তহবিলের জোগান দিলে চলবে না। সংশোধনের ব্যবস্থা না নিলে একদিকে তহবিলের জোগান ঘটবে, অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যাবে। তাই এখনই সময় এসব ব্যাংককে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, পঞ্জিকাবর্ষ শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পরও নানা অনিয়মের কারণে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক— সোনালী, অগ্রণী ও জনতা। প্রতিবেদন তৈরির সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংকের বেশকিছু অনিয়ম খুঁজে পায়। এরপর নতুন করে ঋণ শ্রেণীকরণ করায় আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি নিয়ে বিপাকে পড়ে তারা। ব্যাংকগুলোকে মে মাস পর্যন্ত সময় দেয়া হলেও এর মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদনের কাজ শেষ করতে পারেনি কোনো ব্যাংকই। এখন আবার সময় দেয়া হয়েছে জুন পর্যন্ত।
জানা গেছে, ২০১২ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে আরো ঋণ খেলাপি করে দেয়ায় এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। গত বছর শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বলা হয়েছিল ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। নতুন করে বেশ কিছু ঋণ শ্রেণীকরণ করায় এ হার দাঁড়াবে ১১ দশমিক ১৬ শতাংশে। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২১ দশমিক ৯৩ শতাংশ বলা হলেও নতুন করে ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ শ্রেণীকরণ করায় এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ; অর্থের হিসাবে যা ৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।
বিশ্বস্ত একটি সূত্র বলছে, বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পুনঃতফশিল করে অশ্রেণীকৃত করার প্রক্রিয়া চলছে। এ ঋণ অশ্রেণীকৃত দেখাতেই প্রতিবেদন তৈরিতে অতিরিক্ত সময় পেয়েছে ব্যাংক তিনটি। কয়েক দিন ধরে এ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি ওই তিন ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তবে এরই মধ্যে একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বেক্সটেক্সকে শ্রেণীকৃত দেখিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রূপালী ব্যাংক।
বেক্সিমকো গ্রুপ ঋণ পুনঃতফশিল করার চেষ্টা করছে স্বীকার করে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ঋণ শ্রেণীকরণ করায় বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন এখনো চূড়ান্ত করা যায়নি। তবে এর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
Discussion about this post