আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে আবারো গুঞ্জন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে মালিকপক্ষের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার খবর প্রতিষ্ঠানটির সর্বস্তরের কর্মীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত এক মাসে কমপক্ষে দুই ডজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ব্যাংকটি ছেড়ে গেছেন। ব্যাংকিং খাতের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বর্তমান এমডি মামুন মাহমুদ শাহ পুরনো মালিক ওরিয়ন গ্রুপের কাছে ব্যাংকটি ফেরত দেয়ার জন্য গোপনে আঁতাত করছেন।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এমডি। তবে মালিকানা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে মামুন মাহমুদ শাহ বলেন, ‘আমিও বিষয়টি শুনেছি। তবে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি।’
এদিকে ২০১০ সালের ২৩ জুন আইসিবি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ ব্যাংকটি থেকে তাদের মালিকানা বিক্রির ঘোষণা দেয়। এ সময় সামিট গ্রুপ তা কেনার আগ্রহ দেখালে ওরিয়ন গ্রুপ ব্যাংকটি বিক্রি বন্ধ করতে আদালতে মামলা করে। মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রক্ষিত ওরিয়ন গ্রুপের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ার ফেরত দেয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। আদালত শেয়ার ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে, যা বর্তমানে আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের নভেম্বরে আইসিবি ব্যাংকের আমানতকারীদের ঋণ পরিশোধের সময় শেষ হবে। এর পরই ব্যাংকটির মালিকানা নিতে চায় ওরিয়ন গ্রুপ। এজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে গ্রুপটি। মূলত ব্যাংকের দেনা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আবার ১৪ জুন বর্তমান এমডির চাকরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তিনিও নতুন উদ্যোক্তার অধীনে ব্যাংকটির এমডি হিসেবে থাকতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে আইসিবি গ্রুপ এরই মধ্যে নতুন এমডি খোঁজা শুরু করেছে।
জানা যায়, ২০১১ সালের জুনে ব্যাংকে যোগদানের পরই এমডি মামুন মাহমুদ শাহের সঙ্গে ব্যাংকের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ভিলি ভিলায়াপ্পান ও ঋণ আদায় বিভাগের প্রধান কিসান সিংহ রায়ের সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। মূলত এই দুই বিদেশী কর্মকর্তা ছিলেন পরিচালনা পর্ষদের আস্থাভাজন। এমন পরিস্থিতিতে এই দুই বিদেশী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শর্তের চুক্তি ভেঙে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেও মামুন মাহমুদ শাহ গত ১৩ মে স্বপ্রণোদিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতির মামলা করেন রাজধানীর তেজগাঁও থানায়। একই সঙ্গে তিনি বিনিয়োগ বোর্ডে প্রভাব খাটিয়ে দুই বিদেশী কর্মকর্তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করান।
এদিকে একই সময় পরিচালনা পর্ষদও মামুন মাহমুদকে এমডির পদ থেকে অপসারণ করে। এ ঘটনায় আইসিবি ফিন্যান্স গ্রুপের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মামুন মাহমুদ। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক এমডির এ অপসারণকে নিয়মবহির্ভূত উল্লেখ করে চিঠি দিলে মামুন মাহমুদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করেন।
সাম্প্রতিক এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি ছেড়ে গেছেন আইটি, ইনভেস্টমেন্ট, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান, কয়েকজন শাখা ব্যবস্থাপকসহ মধ্যম পর্যায়ের প্রায় দুই ডজন কর্মকর্তা। আরো অনেক কর্মী চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়ায় আছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে আবার এমডির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া অনুমোদনপত্রে মাসিক ৭ লাখ টাকা বেতন-ভাতা উল্লেখ থাকলেও তিনি প্রতি মাসে ৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন। এভাবে দুই বছরে তিনি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ৫২ লাখ ৮ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির এমডি মামুন মাহমুদ বলেন, ‘আমি যে অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছি তা ব্যাংকের পর্ষদ কর্তৃক চুক্তি অনুযায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া বেতন কাঠামোর কোনো চিঠি আমাকে দেয়া হয়নি।’
প্রসঙ্গত, জেদ্দাভিত্তিক শিল্পপতি আমানুল্লাহ মিয়া ও বাংলাদেশের শিল্পপতি আবুল খায়ের লিটুর মালিকানায় ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে আল-বারাকা ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে। আমানুল্লাহ মিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেলে তাদের শেয়ার বিক্রি করে দেয় হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। ২০০২ সালে তাদের পরামর্শে এর নামকরণ হয় ওরিয়েন্টাল ব্যাংক। ২০০৪ সালে আবারো মালিকানা পরিবর্তন হয়। সে বছরের নভেম্বরে ব্যাংকটির সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেয় ওরিয়ন গ্রুপ। এর পর উদ্যোক্তাদের অর্থ লুটের কারণে বেসরকারি খাতের এ ব্যাংকটি রুগ্ণ হয়ে পড়ে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৬ সালের ১৯ জুন ব্যাংকটির দায়িত্ব নেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক মালিকপক্ষের হাতে থাকা ব্যাংকের মোট ৮৬ দশমিক ২৬ শতাংশ শেয়ারও বাজেয়াপ্ত করে। ২০০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি ব্যাংকটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম সরকার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্থগিত করে এবং পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয় স্কিম তৈরি করে। তখন আইসিবি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ এজি ব্যাংকটির প্রায় ৫১ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় ৩৫১ কোটি টাকায়। আইসিবি গ্রুপ ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক নামকরণ করে। ব্যাংকের স্কিম অনুযায়ী, গত ৪ মে আমানতকারীদের অর্থ ফিরিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও তা দিতে ব্যর্থ হয় ব্যাংকটি। এর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্কিমের মেয়াদ ৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মাহফুজুর রহমান। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শিগগিরই এর সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হবে। এটা হতে পারে পর্ষদ বা আমাদের উদ্যোগে। ব্যাংকটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পরিবর্তন এনেও সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হতে পারে।’ 
Discussion about this post