বেসিক ব্যাংকের অবস্থা শোচনীয়। বিশেষায়িত এ ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া জরুরি বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যাংকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হওয়ায় প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে কঠিন শর্তে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সমঝোতার শর্ত ভাঙলেই গুনতে হবে অর্থ জরিমানা।
এরই মধ্যে সমঝোতাপত্র বেসিক ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হয়। পরিচালনা পর্ষদে সমঝোতাপত্রের অনুমোদন নিয়ে আগামী ৭ জুলাইয়ের মধ্যে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বেসিক ব্যাংকের হিসাবে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকের ঋণস্থিতি ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এ চার বছর তিন মাসে ব্যাংকটি ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়; যার প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সমঝোতাপত্র পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২৭ জুন পর্ষদের বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রতিনিয়ত পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আমাদের ব্যাংকের বিভিন্ন সূচক ক্রমেই ভালোর দিকে যাচ্ছে। এমন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো কড়াকড়ি আরোপ করছে।’
সমঝোতার শর্তানুযায়ী, পুরনো আমানত থেকে কোনো ঋণ দিতে পারবে না বেসিক ব্যাংক। কেবল নতুন আমানতই ঋণ হিসেবে দিতে পারবে। পাশাপাশি ঋণ আদায় ও শ্রেণীকৃত ঋণ কমার লক্ষ্যও নির্দিষ্ট করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক পরিচালনায় কোনো শর্ত ভাঙলেই জরিমানা আরোপ করা হবে। প্রতি প্রান্তিকে বেঁধে দেয়া ঋণপ্রবাহের চেয়ে অতিরিক্ত ঋণ দিলে তার ওপর ব্যাংক হারের সঙ্গে শতকরা ১ ভাগ অর্থাৎ ৬ শতাংশ হারে জরিমানা আরোপ করা হবে। আবার ঋণ প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। সব শাখাকেই তা মানতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্যাংকটির সম্পদের মান, ঋণ আদায় ও ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়া নিম্নপর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সূচক উন্নতির জন্য তাদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে।
জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। শর্তানুযায়ী শ্রেণীকৃত ঋণ জুনে ৭ ও ডিসেম্বরে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এছাড়া ১০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেয়ার বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে। প্রয়োজনে পূর্বানুমতিও নিতে হবে। ব্যাংকের শান্তিনগর, গুলশান, দিলকুশা ও প্রধান শাখায় নিয়ম ভেঙে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই তা নিয়মিত করতে হবে।
ব্যাংকটির দিলকুশা, শান্তিনগর ও গুলশান শাখায় অনিয়মের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি ঋণ শ্রেণীকৃত করাসহ বিভিন্ন নির্দেশ দিলেও সময়মতো তা পালন করা হয়নি। দিলকুশা শাখা থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি, গুলশান শাখা থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ও শান্তিনগর শাখা থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে নানা অনিয়ম করে। এসব ঋণের বেশির ভাগেরই প্রয়োজনীয় নথিপত্র নেই, কোনো কোনো কোম্পানির অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার অনিয়ম তদন্ত করছে দুদক।
এদিকে সম্প্রতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩১৫তম বৈঠকে কয়েকটি ঋণ অনুমোদন করার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তা আটকে দেয়। ১৩ গ্রাহকের অনুকূলে ৩২৩ কোটি টাকার ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পর্ষদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে, এসব ঋণের বিপরীতে জামানত নেই। আবার যেসব জামানত দেখানো হয়েছে, তার বেশির ভাগেরই অস্তিত্ব ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে আটকে যায় বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখার তানজীম ফ্যাশনসের ৩ কোটি, সিলভার কম ফ্রেডিংয়ের ৩৫ কোটি, প্রফিউশন টেক্সটাইলের ১৫ কোটি, আরকে ভিয়ার ৩ কোটি, বিএস ট্রেডিংয়ের ১০ কোটি ও এসপিএন এন্টারপ্রাইজের ৫২ কোটি এবং শান্তিনগর শাখার হাসিব এন্টারপ্রাইজের ৩৬ কোটি, গ্লাস ওয়াটার লিমিটেডের ৪ কোটি, এসওএস ব্রাদার্সের ৪৫ কোটি টাকা। আটকে গেছে বংশাল শাখার আহমেদ স্টিলের ৩ কোটি, প্রধান শাখার আনোয়ার গ্রুপের ৬৫ কোটি, দিলকুশা শাখার বসতি ফুডের ৩ কোটি ও মৌলভীবাজার চৌমোহনা শাখার ইমপেরিয়াল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের ২৫ কোটি টাকার ঋণও।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2013/06/23/5736#sthash.UtllgGBF.dpuf

Discussion about this post