
তিন বছর আগে বাংলাদেশের জাহাজ রফতানিতে ৩৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। সে সময় একের পর এক রফতানি আদেশ আসতে থাকে। স্থানীয় ব্যাংকগুলো ঝুঁকি বিবেচনা না করে উদারভাবে এ খাতের পাশে দাঁড়ায়। তবে জাহাজের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপের মন্দা দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাতিল হয়ে যায় বেশির ভাগ রফতানি আদেশ। এতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমস্যায় পড়ে ব্যাংক।
জানা গেছে, আনন্দ শিপইয়ার্ডকে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ দিয়ে এখন বিপাকে আছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক। বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা ক্ষীণ হওয়ার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংককে বড় অঙ্কের প্রভিশনিং (সঞ্চিতি) সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে ঋণখেলাপি দেখানো থেকে বিরত থাকলেও সঞ্চিতির কারণে ব্যাংকটির মুনাফা আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক আনন্দ শিপইয়ার্ডে বিনিয়োগকৃত ৫৯৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। বেপরোয়াভাবে বিনিয়োগ করার জন্য ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফরিদউদ্দিন আহমেদ দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংককে চিঠিও দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বেপরোয়াভাবে বিনিয়োগে সহযোগিতাকারীদের চিহ্নিত করে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা পরিপালন করে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিষয়টি জানাতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বণিক বার্তাকে জানানো হয়েছে, নিয়মের মধ্যে থেকে সৎ উদ্দেশ্যেই এসব অর্থায়ন করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ এসব ঋণ থেকে সুবিধা নেয়নি। ডাউন পেমেন্ট ব্যতিরেকে পুনঃতফশিল করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতির পরিপ্রেক্ষিতেই। এছাড়া সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা, ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা, আমদানিকৃত কাঁচামালে শুল্ক ও কর মওকুফের বিষয়টি কাজ করেছে তাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে।
২০১২ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৫৬১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। চলতি বছর একই কিংবা তার চেয়ে কম মুনাফা হলে ৫৯৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণের কারণে ব্যাংকটি লোকসানের সম্মুখীন হবে।
ইসলামী ব্যাংক কারওয়ান বাজার শাখার মাধ্যমে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে একের পর এক জাহাজ নির্মাণে অর্থায়ন করা হয়। অভিজ্ঞতা না থাকায় এ অর্থায়নকে বেপরোয়া আখ্যা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০০৭ সালের ২৯ জুলাই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১৫২তম সভায় আটটি জাহাজ রফতানির জন্য চুক্তির বিপরীতে ২৫ কোটি ৬৬ লাখ, ছয়টি পারফরমেন্স বন্ড, বিদেশী ক্রেতার ব্যাংকের অনুকূলে ৩৫৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ২৪টি রিফান্ড গ্যারান্টি ও ২৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ছয়টি ওয়ারেন্ট গ্যারান্টি ইস্যু করার সিদ্ধান্ত হয়। এক্ষেত্রে ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন নীতিমালা ২০০৯ লঙ্ঘন করে জার্মানির প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত না হয়েই বড় অঙ্কের গ্যারান্টি ও পারফরমেন্স বন্ড প্রদান করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, প্রতিষ্ঠানটির আটটি চুক্তির বিপরীতে আসা অর্থের ব্যবহার যাচাই করে গ্রাহককে হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। যেসব চুক্তির বিপরীতে অর্থ এসেছিল, তা বাতিল হয়ে যাওয়ায় ইসলামী ব্যাংককে চুক্তি অনুযায়ী সুদসহ মুনাফা বিদেশী গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে যে পরিমাণ মুদ্রা দেশে এসেছিল, সুদসহ তার চেয়ে বেশি পরিমাণ মুদ্রা বিদেশে পাঠাতে হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহককে অগ্রিম হিসেবে আসা বৈদেশিক মুদ্রা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে, যার বিপরীতে একটি জাহাজেরও রফতানি সম্পন্ন হয়নি। এতেই প্রমাণ হয়, ব্যাংক ও গ্রাহকের যোগসাজশে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
এসব অনিয়মের ঘটনায় ব্যাংকের তত্কালীন শাখা ব্যবস্থাপক, জোনাল হেড, ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়নকারী হিসেবে ক্রেডিট কমিটির সব সদস্যের দায়দায়িত্ব নিরূপণ করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১১ সালের ডিসেম্বর ভিত্তিতে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেয়া ৩০৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার সুবিধা বিরূপ মানে শ্রেণীকৃত করা হলেও ব্যাংক পর্ষদের ২০১তম সভায় কোনো ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই তা ১২ থেকে ১৮ মাস পিরিয়ডে ১০ বছর মেয়াদে পুনঃতফশিল করা হয়, যা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। রফতানি মন্দার কারণে গ্রাহকের নামে সৃষ্ট বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য ফোসর্ড ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
এদিকে ব্যাংকঋণ সময়মতো পরিশোধ না করায় খেলাপি হয়ে পড়ে আনন্দ শিপইয়ার্ড। তা থেকে বাঁচতে হওয়ার উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয় প্রতিষ্ঠানটি। পরিস্থিতির শিকার বিবেচনায় ২০১২ সালের ২২ অক্টোবর আনন্দ শিপইয়ার্ডকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
তবে হাইকোর্টের নির্দেশে সাময়িকভাবে গ্রাহককে খেলাপি হিসেবে না দেখালেও প্রকৃত মুনাফা প্রদর্শনের স্বার্থে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে গ্যারান্টির বিপরীতে সৃষ্ট ৪৩৪ কোটি ২২ লাখ টাকার বিনিয়োগ ক্ষতিজনক মান ধরে সঞ্চিতি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এছাড়া গ্রাহককে দেয়া ৯৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকার মুরাবাহা পোস্ট ইমপোর্ট, ৮ কোটি ৩ লাখ টাকার মুরাবাহা ট্রাস্ট রিসিট, ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার কর্জের বিপরীতে ঋণ সহায়তা ও ৫০ লাখ টাকার মুরাবাহা কমার্শিয়াল একই মানে সঞ্চিতি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইভাবে ১৭ জুনের মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যারান্টি ফোর্সড ঋণের মাধ্যমে নগদায়ন করতে হলে ৪৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ক্ষতিজনক মানে সঞ্চিতি করতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকটিতে ৫৯৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা সঞ্চিতি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এসব বিষয়ে আনন্দ শিফইয়ার্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ পুনঃতফশিলের চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এজন্য যেসব আনুষ্ঠানিকতা প্রয়োজন, তার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে আনন্দ শিপইয়ার্ড। আশা করছি, শিগগিরই সংকট কেটে যাবে।’
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2013/06/27/6196#sthash.BeikfGsT.dpuf
Discussion about this post