প্রথমে হতবাক। তারপর ক্ষোভ। আর এখন ভয়! বিগত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাতের অবক্ষয় ও অব্যবস্থাপনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। দুর্নীতি ও অসাধুতার দুঃসহ তথ্যে দেশের সবাই শিউরে উঠছেন। আর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল ভূমিকা কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। গরিবের ব্যাংকিং, সবুজ ব্যাংকিংয়ের সস্তা জনপ্রিয়তায় মোহাচ্ছন্ন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের প্রশাসক ভাবমূর্তি নিয়ে এরই মধ্যে বিস্তর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক ম্যাগাজিন গ্লোবাল ফিন্যান্স ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে ‘সি’ ক্যাটাগরির গভর্নর হিসেবে চিহ্নিত করে। যদিও এশিয়ার অনেক দেশের গভর্নরই রয়েছেন ‘এ’ ক্যাটাগরিতে।
ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য পর্যালোচনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে যেসব সূচক ব্যবহার হয়, তার সবগুলোতেই গত কয়েক বছরে অধোগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। শৃঙ্খলার অভাব, বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ও আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অধিকাংশ ব্যাংকই মুনাফা হারাচ্ছে। নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সূচকগুলো। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতাও ক্রমেই প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখোমুখি হতে হয়েছে ঊর্ধ্বতন কয়েকশ ব্যাংক কর্মকর্তাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকের বিভিন্ন সূচকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ পাচ্ছে। সূচক ভালো করার জন্য এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংক চালাতে হবে নিয়মকানুন মেনে। তা না হলে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সূচকগুলোর অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রধান প্রধান সূচক যেমন— নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটি অবনতির দিকে যাচ্ছে। ব্যাংকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় মূলত এসব সূচক বিচেনায় নিয়েই।
ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘বিভিন্ন সূচকের অবনতি হলেও আশা করছি, দ্রুতই সব ঠিক হয়ে আসবে। ব্যাংকগুলোকে নজরদারি বাড়াতে হবে। বর্তমানে দক্ষ কর্মকর্তার অভাব চূড়ান্তভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। নতুন ব্যাংক আসায় তা আরো বেড়েছে। প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মকর্তাদের দক্ষ করে তোলার বিকল্প নেই।’
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের ২০১১ ও ২০১২ সালের পরিচালন আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের হার বিশ্লেষণ করেছে বণিক বার্তা। এতে দেখা গেছে, ২০১২ সালে দুটি ব্যাংক বাদে সব ব্যাংকেরই পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে ১৬টি ব্যাংকের ব্যয় এ খাতের গড় অবস্থানের চেয়ে ওপরে রয়েছে। ২০১২ সালে পরিচালন আয়ের ৪৪ শতাংশই পরিচালন ব্যয়, যা আগের বছরে ছিল ৪০ শতাংশ।
এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বিভিন্ন কারণে একটু বেশি। প্রাইমারি ডিলার ব্যাংক হিসেবে আমরা সরকারকে ঋণের জোগান দিয়ে থাকি। এছাড়া বাংলাদেশে ব্যাংকের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। আবার ব্যয়ও কমছে না। এসব কারণেই পরিচালন ব্যয় উচ্চ।’
ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই করা হয় এনপিএল অনুপাতের মাধ্যমে। আইএমএফের তথ্যানুসারে, ২০১০ সালে ব্যাংকিং খাতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১১ সালে যা কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১ শতাংশে। তবে গেল বছর তা অনেকটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। এ সূচক বৃদ্ধি পাওয়া ব্যাংকিং সম্পদের মান অবনতির বহিঃপ্রকাশ। অর্থাত্ ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে।
এ হার আবার বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চেয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বেশি। ২০১০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এনপিএল অনুপাত ১৫ দশমিক ৭ থেকে কমে ২০১১ সালে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে। তবে ২০১২ সালে তা বেড়ে হয় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ১, ২ দশমিক ৯ ও ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশিষ্ট ব্যাংকার ও সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, নতুন নীতিমালার কারণে এনপিএল বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের অন্য সূচকে। ব্যাংকগুলো অযোগ্য গ্রহীতাকে ঋণ দেয়ায় বাজারে অসম প্রতিযোগিতার প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন চাপে ঋণ দেয়ায় সূচকগুলো খারাপ হচ্ছে। যত দিন নির্দিষ্ট সম্পদের বিপরীতে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকবে, তত দিন পর্যন্ত সূচকগুলো ভালো হবে না। নতুন ব্যাংকগুলো আসায় সূচক আরো খারাপ হতে পারে।
ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা তাদের বিনিয়োগের কী হারে মুনাফা পাচ্ছেন, তার ধারণা পাওয়া যায় রিটার্ন অন ইকুইটির মাধ্যমে। আইএমএফের তথ্যমতে, ২০১০ সালে এ খাতে রিটার্ন অন ইকুইটির হার ছিল ২১ শতাংশ, ২০১১ সালে যা কিছুটা কমে হয় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১২ সালে তা আরো কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২ শতাংশে। ব্যাংকের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের লাভের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে কমছে; যার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এ হারের সংকোচন থেকে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ হার ২০১০ সালের ২০ দশমিক ৯ থেকে কমে ২০১২ সালে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এ হার ২০১০ সালে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও ২০১২ সালে তা ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। অর্থাত্ লোকসানে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।
সম্পদের বিপরীতে কী হারে মুনাফা হচ্ছে, তা বোঝা যায় রিটার্ন অন অ্যাসেটের মাধ্যমে। ২০১০ সালে এ হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র দশমিক ৬ শতাংশে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে ২০১০ সালে এ হার ছিল ২ দশমিক ১ শতাংশ, গত বছর যা কমে দাঁড়ায় দশমিক ৯ শতাংশে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ২০১০ সালে এ হার ১ দশমিক ১ শতাংশ থাকলেও ২০১২ সালে তা ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
ব্যাংকের পরিচালন আয়-ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সালে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। তবে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ হারে। এ কারণে আশানুরূপ মুনাফা করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। নতুন শাখা, কর্মীদের বেতন ও সার্বিকভাবে ব্যবস্থাপনা খরচ বৃদ্ধিতে এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। পরিচালন আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে খাতের গড় হার ৪৪ শতাংশ হলেও এ হার ৩০-৩৫ শতাংশ থাকা যৌক্তিক।
প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান খসরু এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমে যাওয়ায় অন্য সব সূচকের অবনতি হয়েছে। এসব সূচকের অবনতি অদক্ষ ব্যবস্থাপনার বহিঃপ্রকাশ। তবে শুধু অদক্ষ ব্যবস্থাপনাই নয়, দেশে ব্যবসাও ছিল না। এসবও সূচক অবনতির জন্য দায়ী।
তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর নতুন শাখা খোলা হয়। এসব শাখা ওই বছরই মুনাফা করতে পারে না। নতুন শাখার পাশাপাশি নতুন কর্মী নিয়োগ, পদোন্নতি ও বেতন বাড়াতে হয়। এসব কারণে প্রতি বছর ব্যয় বাড়ে। পরিচালন আয়ের সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পরিচালন ব্যয় হলে ভালো। এটাই হওয়া উচিত।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালে লোকাসানি আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের আয়ের ৯০ শতাংশ পরিচালন ব্যয়। এছাড়া দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলোরও ব্যবস্থাপনা ব্যয় এ খাতের গড় হারের চেয়ে অনেক বেশি। ২০১২ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয় আয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ। আগের বছর এ হার ছিল ২৫ শতাংশ। আইএফআইসি ব্যাংকের আয়ের ৫৭ শতাংশ পরিচালন ব্যয়।
আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার বলেন, ‘বিশ্বের ভালো ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় আয়ের ৩০ শতাংশের নিচে থাকে। বাংলাদেশে ব্যবসার খরচ বেশি। এ কারণেই এটা বেশি। আমাদের ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও অনেক বেশি।’
http://bonikbarta.com/first-page/2013/06/30/6669

Discussion about this post