ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রতি ডলারে সাড়ে ৩ টাকা বেশি পাচ্ছেন সুবিধাভোগীরা। ফলে প্রবাসীরাও রেমিট্যান্স পাঠাতে এ মাধ্যমের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এ সুযোগে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছে হুন্ডিচক্র। এতে ব্যবসা হারাচ্ছে ব্যাংকগুলো। শুধু আগস্টেই ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে জুলাইয়ের চেয়ে ২৩ কোটি ডলার কম।
হুন্ডিচক্রের সক্রিয়তার বিষয়টি স্বীকার করেন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, এর ফলে ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবসা কমে আসবে। ব্যাংকের বাইরে ডলারের দামে যে পার্থক্য দেখা দিয়েছে কোনোভাবেই তা কাম্য নয়।
জানা গেছে, বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে সুবিধাভোগীরা প্রতি ডলারের বিপরীতে পাচ্ছেন গড়ে ৭৭ টাকা ৭৫ পয়সা। অথচ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে পাঠালে পাচ্ছেন ৮১ টাকা ৫০ পয়সার বেশি। এ কারণেই ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রেমিট্যান্স পাঠাতে চাইছেন প্রবাসীরা, যার প্রভাব পড়েছে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহে। গত আগস্টে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে দাঁড়ায় ১০০ কোটি ডলারে। জুলাইয়েও এর পরিমাণ ছিল ১২৩ কোটি ডলার।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, দেশের বাইরে মানুষের যাতায়াত বেড়ে গেছে। এ কারণে ডলারের ওপর চাপ পড়েছে। কারণ বৈধভাবে ৫ হাজার ডলারের বেশি নেয়া যায় না। তবে ডলারের দামের যে পার্থক্য দেখা দিয়েছে তা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ লেনদেনে জড়িত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের গ্রাহক বেড়ে গেছে। আবার হজ মৌসুম হওয়ায় ডলারের বাড়তি চাপও রয়েছে। এ কারণে ব্যাংকের সঙ্গে ডলারের দামের এ পার্থক্য দেখা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, সরবরাহ ও চাহিদার অসামঞ্জস্যের কারণেই ডলারের দামের এ পার্থক্য। হজের কারণে এমনটা হতে পারে। তবে এর ফলে অবৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা উত্সাহিত হলো কিনা সেটা ভেবে দেখতে হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা, বনানী, মহাখালী ও গুলশানে কয়েকটি চক্র হুন্ডি ব্যবসায় সক্রিয়। কয়েকটি এক্সচেঞ্জ হাউসের বিরুদ্ধেও এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতি বছর এসব এক্সচেঞ্জ হাউস পরিদর্শন করা হলেও তত্পরতা বন্ধ হয়নি।
রাজধানীর বাইরে সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ফরিদপুরেও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। সিলেট বিভাগে অনুমোদনপ্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ১৪টি। সিলেট নগরীর দরগা গেটে সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখার নিচে সুরমা সুপার মার্কেট বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। এ মার্কেটে লেনদেনের জন্য সাতটি প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিলেও সেখানে অবৈধভাবে ব্যবসা করছেন শতাধিক ব্যবসায়ী। সিলেটের প্রবাসীরাও বৈধ পথের চেয়ে অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিলেটে হুন্ডিতে টাকা লেনদেন হয় বিভিন্ন ট্রাভেলস এজেন্সির আড়ালে। সুরমা মার্কেট, লালদীঘির পাড়, মহাজনপট্টি, জিন্দাবাজার, দক্ষিণ সুরমা, বিয়ানীবাজার ও কালীঘাট এলাকার কয়েকটি ট্রাভেলস এজেন্সির আড়ালে হুন্ডি ব্যবসা হয়ে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন টেইলারিং কারখানা, ফার্মেসি, কাপড়ের দোকানেও মূল ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি ব্যবসা হয়। মাইক্রোবাস, কার, অটোরিকশার মাধ্যমে হুন্ডির টাকা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার নুরে আলম বলেন, হুন্ডি রোধে পুলিশের বিশেষ নজরদারি রয়েছে। এ ব্যবসার নেপথ্যে যারা রয়েছে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ডলারের দাম কমার সম্ভাবনা থাকায় কেউ ডলার ধরে রাখতে চাইছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর খুচরা ডলার বিক্রিও কমে এসেছে। ফলে বিদেশ যেতে ইচ্ছুকরা বাধ্য হয়ে খোলাবাজারের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ছে। এ কারণে ডলারের বাজারে এ অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএ ফারুকী বলেন, চাহিদা বেশি হওয়ার কারণেই খোলাবাজারে ডলারের দাম বেড়ে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স কমে গেছে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ঈদুল আজহা সামনে রেখে চলতি মাসেই রেমিট্যান্স বেড়ে যাবে।
রেমিট্যান্স বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত চার বছরে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ব্যাংকগুলোর সাতটি নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউস থাকলেও বর্তমানে তা ২৯টিতে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ সালে ৯টি, ২০১০ সালে ৯টি ও ২০১১ সালে ৩টি নিজস্ব একচেঞ্জ হাউস চালু করেছে ব্যাংকগুলো। এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যেই রয়েছে ১৪টি। বাকিগুলো রয়েছে— সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিস, অস্ট্র্রেলিয়া, ইতালি ও মালদ্বীপে। আজ মঙ্গলবার মালয়েশিয়ায় সিটি ব্যাংকের নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউস চালুর কথা রয়েছে। এর বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৯৪১টি স্থান থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুবিধা রয়েছে বাংলাদেশে। এজন্য বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো ২৯২টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলো নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউস খুলতে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে বেশি প্রবাসী অধ্যুষিত সৌদি আরব, দুবাই, লেবাননের মতো দেশে এক্সচেঞ্জ হাউস খুলতে আগ্রহী নয় ব্যাংকগুলো। রেমিট্যান্স পাঠাতে এসব দেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও মানিগ্রামের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এসব দেশেই মূলত হুন্ডিচক্র সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
– See more at: http://bonikbarta.com/last-page/2013/09/10/15376#sthash.PkJVXEVt.FvRb9nur.dpuf

Discussion about this post