পেঁয়াজের সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন একশ্রেণীর ব্যবসায়ী। ভারত সরকারের বেঁধে দেয়া টনপ্রতি ৯০০ ডলার মূল্যে ঋণপত্র খুললেও পণ্যটি কিনছেন ৬০০ ডলারে। এতে প্রতি টন পেঁয়াজ আমদানি বাবদ ৩০০ ডলার দেশটিতে রেখে দিচ্ছেন তারা। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে ব্যাংকিং চ্যানেলে সে দেশে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে এ অর্থ।
কয়েক মাস ধরে ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকায় অস্বস্তিতে পড়ে সে দেশের সরকার। বাজার স্বাভাবিক রাখতে রফতানি মূল্য বাড়িয়ে দেয়া হয়। আগস্টের শেষদিকে ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে টনপ্রতি পেঁয়াজের সর্বনিম্ন রফতানি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৯০০ ডলার। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে এ মূল্য ধরেই ঋণপত্র খুলছে ব্যাংকগুলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেঁধে দেয়া মূল্যের অনেক কমে ভারতে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। দু-তিন সপ্তাহ পর নতুন মৌসুম শুরু হবে। রফতানি মূল্যও তখন কমে আসবে। ওই সময়ই অতিরিক্ত মূল্যে খোলা ঋণপত্রের পেঁয়াজ আমদানি হবে। এতে করে বেশি পরিমাণ অর্থ ভারতে রেখে দেয়ার সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা। এ বিবেচনায় চাহিদার অতিরিক্ত ঋণপত্র খুলছেন তারা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ভারত থেকে বেশি দামে পেঁয়াজ আমদানির নামে বড় অঙ্কের অর্থ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা পরে এসব অর্থ ব্যবহার করবেন। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কৌশল হিসেবেও পণ্যটির দাম বাড়ানো হতে পারে। তবে ভারত সর্বনিম্ন রফতানি মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ায় এ বিষয়ে করার কিছু নেই।
জানা যায়, গত মে মাসে ভারত থেকে প্রতি টন পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ছিল ১৩০ ডলার। তবে আগস্টে তা দাঁড়ায় ৬৫০ ডলারে। পরে এ মূল্য ৯০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়; বর্তমানেও তা অব্যাহত।
পেঁয়াজ আমদানিতে ঋণপত্র খোলে এমন দুটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘ভারতের বাজারে পণ্যটির মূল্য কম, এটা জানা সত্ত্বেও আমাদের ৯০০ ডলারের বেশিতে ঋণপত্র খুলতে হচ্ছে। কারণ ভারত সরকার সর্বনিম্ন ৯০০ ডলার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে যে অর্থ পাচার হচ্ছে, এটা বোঝার পরও আমাদের কিছু করার থাকছে না।’
তবে বেশি অর্থ চলে গেলে তা অন্য পণ্যের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় হয়ে যায় বলে দাবি করেন পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের পেঁয়াজ আমদানিকারক রাজবাড়ী ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী আবদুল মাজেদ। তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে আমরা শুধু পেঁয়াজ নয়, মরিচ, আদাও আমদানি করে থাকি। পণ্যটির ঋণপত্রে বেশি অর্থ চলে গেলে এসব পণ্যের মূল্যের সঙ্গে তা সমন্বয় হয়ে যায়।’
ভারত থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ আমদানি করা হলেও দেশে তা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার উপরে। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, আমদানি ব্যয় ও পথে পথে চাঁদাবাজিকে এর কারণ হিসেবে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে দাম বাড়তে থাকায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ আমদানিতে সুদের হার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে সংকট মেটাতে চীন, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকেও পণ্যটি আমদানি শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। গত সপ্তাহে পাকিস্তান থেকে প্রতি টন পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ছিল ৪৮০ ডলার। মিয়ানমার ও চীনের পেঁয়াজের মূল্যও এর কাছাকাছি। তবে এসব দেশের পেঁয়াজের মান ভালো না হওয়ায় দেশে এর চাহিদা কম বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক শহীদুল ইসলাম বলেন, ভারতে পণ্যটির দাম আমদানি মূল্যের তুলনায় কম। তবে ভারত সরকার ৯০০ ডলারের নিচে রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় দাম হঠাত্ বেড়ে গেছে। ১৫-২০ দিনের মধ্যে দেশে পেঁয়াজের দাম কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনায় পেঁয়াজের আবাদ অধিকাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দেশটিতে এর সংকট দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে বাজারে। ভারতে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার কারণে রফতানি মূল্য বাড়ায় সে দেশের সরকার। ফলে বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার হয়ে ওঠে অস্থিতিশীল। গত তিন মাসে পণ্যটির দাম বেড়ে হয়ে গেছে প্রায় আড়াই গুণ।
জুলাইয়ে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ছিল ৩৮-৪০ টাকা। আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫-৭০ টাকা। গত মাসে তা ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। একই অবস্থা দেশী পেঁয়াজের দামেও। জুলাইয়ে দেশী পেঁয়াজের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪০-৪২ টাকা। আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ৭০-৮০ টাকা। বর্তমানে ১১০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এটি।
উল্লেখ্য, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২২ লাখ টন। এর মধ্যে উত্পাদন হয় ১৬ লাখ টন ও আমদানি ৬ লাখ টন। পাবনা, ঈশ্বরদী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর জেলায় বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ উত্পাদন হয়। আর আমদানির মধ্যে বেশি রয়েছে ভারতের পেঁয়াজ।
– See more at: http://bonikbarta.com/last-page/2013/11/02/21007#sthash.WaUlP71w.dpuf
Discussion about this post