একসময় বড় প্রকল্পে অর্থায়ন মানেই ছিল সোনালী ব্যাংক। আস্থার আমানতে ভরসা ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংক। তবে এমন তারকা ব্যাংকটির প্রতি আস্থা এখন তলানিতে ঠেকেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত তিন বছরে ব্যাংকটি অর্থায়নের জন্য খুঁজে পাচ্ছে না নতুন কোনো প্রকল্প। এর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত গ্রহণ আর ট্রেজারি ব্যবস্থাপনার মধ্যে।
উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে ঋণ প্রদানের প্রচারণা চালিয়েও গ্রাহক পাচ্ছে না সোনালী ব্যাংক। শাখা ব্যবস্থাপকদের কয়েক দফা নির্দেশনা পাঠানোর পরও কোনো ঋণগ্রহীতা খুঁজে পায়নি ব্যাংকটি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সিন্ডিকেশন ঋণে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে অন্য ব্যাংকগুলোকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সোনালী ব্যাংক থেকে হল-মার্ক গ্রুপ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পরই ব্যাংকে কর্মরতদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা করার পর পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। কর্মরত বেশ কিছু কর্মকর্তা চাকরিও ছেড়ে দেন। পাশাপাশি পদ পরিবর্তন করা হয় একাধিক কর্মকর্তার। এমন সব পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির সঙ্গে গ্রাহকদের সম্পর্কের দূরত্ব বাড়তে থাকে। অনেক গ্রাহক অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন এ ব্যাংকের সেবা গ্রহণে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয় ঋণ বিতরণ কার্যক্রম।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রচারণা চালিয়েও ঋণ দিতে পারছি না আমরা। গত বছর ঋণ সরবরাহ হয়নি অর্থাভাবে আর এবার উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়েও গ্রাহক খুঁজে পাচ্ছি না। ছোট কিছু গ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে, তবে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগই করতে পারছি না। দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, ঋণ বিতরণে ব্যর্থ হলে শাখা ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
গ্রাহক আস্থাসংকট কাটাতে ও ঋণগ্রহীতা আকর্ষণে ব্যাংকটি তাদের ঋণসেবা বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও প্রকাশ করে। তার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। কিছু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ দেয়া হয়েছে। আর নিয়মিত কয়েকজন গ্রাহককে সরবরাহ করা হয়েছে পরিচালন মূলধন। তবে কোনো মেয়াদি ঋণ অনুমোদন হয়নি। কারণ এ ঋণ চেয়ে কোনো আবেদনও জমা পড়েনি। পরিস্থিতি উত্তরণে শাখা ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কয়েক দফা আলোচনাও কাজে আসেনি। এ অবস্থায় চলতি সপ্তাহে উপমহাব্যবস্থাপক ও মহাব্যবস্থাপকদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৫ লাখ ৯২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। আর ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকটির আমানত প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৭১ শতাংশ আর ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ঋণ ও আমাতের সুদহারের ব্যবধানও (স্প্রেড) দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশে। জুন শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের পরিচালক জায়েদ বখ্ত ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। তাই প্রচারনা চালিয়েও বড় কোনো ঋণ দেয়া সম্ভব হয়নি।
তবে পরিচালন মূলধন দেয়া হচ্ছে এবং ঋণসীমাও বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেকের মনে এ ধারণাও আছে যে, সোনালী ব্যাংক ঋণ দিতে সক্ষম নয়। তাই অনেকে আসছেন না। তবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। এজন্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
ব্যাংকটির শুধু রাজধানীর শাখায় নয়, চট্টগ্রাম শাখায়ও বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটে। ব্যাংকের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখার নিয়মিত গ্রাহক হওয়ার সুবাদে বিশ্বাস করে কয়েকটি গ্রুপকে ঋণ দেয়া হয়; ব্যাংকিং ভাষায় যাকে বলা হয় এলটিআর। আমদানি করে এসব পণ্য বিক্রির পর ঋণ শোধ করার শর্ত থাকলেও তা শোধ করেনি গ্রুপগুলো। ফলে এসব ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বেরিয়ে আসে, এসব ঋণের বিপরীতে কোনো পণ্যও পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ পণ্য কেনার জন্য ঋণ নেয়া হলেও তা অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। আবার অনেকে পণ্য বিক্রি করে অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তর করেছেন। কুয়িন্টন ট্রেডিংয়ের কাছে এ ব্যাংকের পাওনা ১৪ কোটি, ভেনাস ট্রেডিংয়ে ৬৫ লাখ, ইমাম ট্রেডার্সে ৮০ কোটি ৯৮ লাখ, এ কে ট্রেডার্সে ৪৩ কোটি, জাসমিন ভেজিটেবলে ৮৩ কোটি, মহিউদ্দিন করপোরেশনে ৩২ কোটি, কামাল এন্টারপ্রাইজে ২৮ কোটি ও এসএ অয়েল রিফাইনারির কাছে ২৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৩১২ কোটি টাকা।
সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে হল-মার্কের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের বাইরে আরো ছয়টি শাখা থেকে বৈদেশিক বাণিজ্যের নামে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বের করে নেয়া হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির স্থানীয় শাখা থেকে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, কেএনএস ইন্ডাস্ট্রিজ, ক্যাংসান ইন্ডাস্ট্রিজ, থারমেক্স টেক্সটাইল, ইকো কটন মিলস ও রহিমা ফুড করপোরেশন নামের কোম্পানিগুলো প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধ না করেই তা খালাস করে নেন আমদানিকারকরা; যার বিপরীতে তেমন কোনো সহায়ক জামানতও নেই। অ্যাকোমোডেশন বিল তৈরি করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় তা স্বীকৃত বিলে পরিণত করে ফোর্সড ঋণের মাধ্যমে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, অলটেক্স ফেব্রিকস, এপেক্স উইভিং ও ফিনিশিং, পদ্মা পলি কটন, কেএসএস নিট ও পিলুসিড কোম্পানি। অভ্যন্তরীণ তদন্তে চট্টগ্রামের লালদীঘি করপোরেট শাখা ও নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখা থেকে গ্রাহককে অনৈতিকভাবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার প্রমাণ মিলেছে।
ব্যাংকের ২০১১ ও ২০১২ সালে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ পরিদর্শনে অর্থ লোপাটের এসব তথ্য উদঘাটন হলেও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা পরিচালনা পর্ষদ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং চিহ্নিত অসাধু কোনো কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বদলি করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংক বঙ্গবন্ধু এভিনিউ করপোরেট শাখা থেকে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে পারটেক্স সুগার মিলের অনুকূলে ২৫০ কোটি টাকার চারটি ঋণপত্র স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাংকের সরাসরি ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি এবং ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার শ্রেণীকৃত ঋণ সৃষ্টি করা হয়। আমদানিকারক ১২৫ কোটি টাকার চিনি বিক্রি করলেও ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ না করে তা অন্য খাতে সরিয়ে নেন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ শাখার কর্মকর্তাদের সহায়তায় ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মেসার্স ওরিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল ও মেসার্স মারজান টেক্সটাইল মিলস ভুয়া আইবিপি ঋণ সৃষ্টি করে ব্যাংকের প্রায় ৯ কোটি ৪৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2013/11/03/21108#sthash.JmggiO6c.dpuf
Discussion about this post