২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে গৃহনির্মাণ বাবদ নতুন ঋণ বিতরণ করে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ব্যাংকের ইতিহাসে কর্মীদের এ পরিমাণ ঋণ নেয়া যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। একই বছরে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে আলোচনায় আসে রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংক। গত কয়েক বছরে অনিয়মের তথ্য ঢাকতে ব্যাংকটি নিজস্ব কর্মীদের সন্তুষ্টি অর্জনে ঢালাওভাবে এ ঋণ দেয়। আবার অনেকে অবৈধ আয় আড়াল করতেও নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। অথচ সে সময় তারল্য সংকটে পড়ে ব্যবসা হারালেও নিজ কর্মীদের ঋণগ্রহণ বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজধানীর এমন সব এলাকায় ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে, যা তাদের ঋণ ও বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব ফ্ল্যাটের কোনো কোনোটির মূল্য ২ কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্র নিশ্চিত করেছে, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া ২৫ থেকে ৬০ লাখ টাকা ও হল-মার্কের উপঢৌকন দিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকা ও গ্রামে আধুনিক বাড়ি বানিয়েছেন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। অনেকে হল-মার্ক থেকে নেয়া অর্থ বৈধ করতেই এ খাতে ঋণ নেন। এতে ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তারাও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি গৃহঋণ পেতে উত্সাহী হয়ে ওঠেন। এসব কারণেই ওই সময়ে সোনালী ব্যাংকের গৃহঋণ বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
সোনালী ব্যাংকের চার দশকের ইতিহাসে গৃহঋণ বিতরণ কোনো বছরই ২০০-৩০০ কোটি টাকার বেশি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ খাতে ২০১০ সাল শেষে ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ৯ কোটি টাকা। ২০১১ সালে এ স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৭৩ কোটি আর ২০১২ সালে হয় ৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ২০১২ সালে ঋণের স্থিতি বৃদ্ধির ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকার পুরোটাই নতুন ঋণ বলে সোনালী ব্যাংকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঠিক কী কারণে ২০১২ সালে স্টাফদের গৃহনির্মাণে এত ঋণ গেছে, তা জানি না। তবে সে বছরই এ খাতে ঋণসীমা বাড়ানো হয়। এ কারণেও পরিমাণ বেশি হতে পারে।’
২০১২ সালেই ব্যাংকটির গৃহঋণের সীমা বাড়িয়ে দেয়া হয়। আগে একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ৩২ লাখ টাকা পেলেও বর্তমানে তা ৬০ লাখ টাকায় উত্তীর্ণ করা হয়েছে। চাকরি স্থায়ী হওয়ার পাঁচ বছর অতিক্রম হওয়ার পর সব কর্মকর্তাই এ ঋণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। সর্বনিম্ন ২৫ থেকে ৬০ লাখ টাকার মধ্যে এ ঋণের সীমা নির্ধারিত। এ ঋণের সুদহার ব্যাংক হারের সমান। বর্তমানে ব্যাংক হার সাড়ে ৫ শতাংশ।
এ ঋণ বেতন থেকে কেটে রাখা হয়, তাই ঝুঁকিমুক্ত বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের পরিচালক জায়েদ বখ্ত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সে সময়ে যদি নিয়মনীতি মেনে এত টাকা দেয়া হয়, তবে সমস্যা নেই। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা রাখতেই হয়।
জানা গেছে, ১/১১-র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিশ্ব্যাংকের পরামর্শে ২০০৭ সালে ডুবতে থাকা সোনালী ব্যাংককে বাঁচাতে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। এ সময় ব্যাংকটিকে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা মেনে ব্যাংক পরিচালনা করতে হবে। এছাড়া প্রচলিত ব্যাংকের মতো ব্যবসায় মুনাফাকে প্রাধান্য দেয়ার শর্তও দেয়া হয়। এ সময় ব্যাংকটি উন্নতির দিকে গেলেও ২০১০ সালের পর বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়নের পাশাপাশি ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ২০১১ সালে হল-মার্কের মতো অখ্যাত কোম্পানি ব্যাংক থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বের করে নেয়। সোনালী ব্যাংক স্বীকৃতি দেয়ার ফলে অন্য ব্যাংক থেকেও অর্থ বের করে নেয় গ্রুপটি।
গত সেপ্টেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৯৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির গ্রাহক আস্থা কমে আসায় ঋণ ও আমানতের সুদের হারে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশে। মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটি তহবিল চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করলে বর্তমানে তা প্রক্রিয়াধীন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
গত তিন বছরে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নতুন কোনো প্রকল্প খুঁজে পাচ্ছে না অর্থায়নের জন্য। সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত গ্রহণ আর সরকারের ট্রেজারি দেখা ছাড়া তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে প্রচারণা চালিয়েও ঋণ দিতে পারছে না ব্যাংকটি। শাখা ব্যবস্থাপকদের কয়েক দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর পরও কোনো ঋণগ্রহীতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2013/12/19/26169#sthash.czZeuH5y.dpuf

Discussion about this post