দেশে এখন ভোজ্যতেলের চাহিদা ১৪ লাখ টন। কিন্তু আমদানি ও উৎপাদন মিলিয়ে দেশে তেলের জোগান ১৭-১৮ লাখ টন। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল আমদানি হচ্ছে। চাহিদার অতিরিক্ত এই তেল বৈধ পথে কোথাও রফতানি হচ্ছে কিনা, তারও কোনো সরকারি হিসাব নেই।
তেল আমদানির নামে দেশ থেকে অর্থ পাচার হওয়ার সন্দেহ করছেন কেউ কেউ। আবার দেশের বেশ কয়েকটি তেল আমদানিকারক ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করায় বিপাকে পড়েছে ব্যাংকগুলো। ২০১৩ সালেই চট্টগ্রামের কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আদায়ে মামলা হয়েছে। ভোজ্যতেল খাতে নেতৃত্বে থাকা ব্যবসায়ীদের কারো কারোর কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং দুবাইয়ে ব্যবসায়িক ও আবাসিক স্থাপনা গড়ে তোলার কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত। সব মিলিয়ে ভোজ্যতেলের উদ্যোক্তা ও আমদানিকারকদের আচরণ রহস্যময়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছর ভোজ্যতেল ও তেলবীজের মোট আমদানি ছিল ৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকার। পরের অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা; যা ডলার ও পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে কিছুটা সঙ্গতিপূর্ণ। তবে ২০১১-১২ অর্থবছর আমদানি বাড়ার হার চোখে পড়ার মতো। এক বছরের ব্যবধানে ভোজ্যতেল ও তেলবীজ আমদানি ৭৪ শতাংশ বেড়ে হয় ১৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তার আগের অর্থবছরের তুলনায় আমদানি কিছুটা কমলেও পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৪১ কোটি টাকার।
যৌক্তিক কারণেই ভোজ্যতেল আমদানি বেড়েছে বলে মনে করেন প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এহসান খসরু। এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, জনপ্রতি ভোজ্যতেল ব্যবহারও বেড়ে গেছে। এ কারণে বেশি আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বলেন, তেলের চাহিদা বাড়েনি। তবে কী কারণে মিল মালিকরা আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছেন, তা অজানা। চাহিদার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় এর সুযোগ নিচ্ছেন অনেকে। আবার এর অপব্যবহারও করছেন কেউ কেউ। ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতাই তার প্রমাণ দিচ্ছে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছর ভোজ্যতেল ও তেলবীজ আমদানি ছিল ১৪ লাখ টন। এর মধ্যে ভোজ্যতেল ১২ লাখ ৫০ হাজার ও তেলবীজ দেড় লাখ টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২১ হাজার টন। এর মধ্যে ভোজ্যতেল ১৪ লাখ ৫০ হাজার ও তেলবীজ ৩ লাখ ৭১ হাজার টন। তবে গত অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭৫ হাজার টন। এর মধ্যে ভোজ্যতেল ১৩ লাখ ২০ হাজার ও তেলবীজ ৪ লাখ ৫৫ হাজার টন। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই ভোজ্যতেল ৫ লাখ ৬০ হাজার ও তেলবীজ ১ লাখ ৬০ হাজার টন মিলে আমদানি হয় মোট ৭ লাখ ২০ হাজার টন। আর কয়েক অর্থবছর ধরে দেশে ৭-৮ লাখ টন তেলজাতীয় শস্য উৎপাদন হচ্ছে; যা থেকে গড়ে আড়াই লাখ টন ভোজ্যতেল উৎপাদন সম্ভব।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য অনেকটাই কমে এসেছে। কমেছে টাকার বিপরীতে ডলারের মানও। এ অবস্থায় কম টাকায় বেশি পরিমাণ তেল আমদানির সুযোগ রয়েছে। অথচ আমদানি যেমন বাড়ছে, তেমনি টাকার পরিমাণও বেড়েছে। এতে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের সন্দেহ দানা বাঁধে। এ সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতায়। আবার তেলের নাম করে অন্য কোনো পণ্য আসছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপীই আমদানির নামে অর্থ পাচার হয়। বাংলাদেশেও তা হচ্ছে কিনা, বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত।
ব্যাংকিং খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোজ্যতেল ব্যবসায় ঋণ দিয়ে বিপাকে রয়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ২০১০ সালের পর হঠাৎ করেই ভোজ্যতেল আমদানি বাড়িয়ে দেন। ব্যাংকগুলোও ঝুঁকি বিবেচনা না করে তাদের অর্থায়ন করে।
আমদানি করা তেল পরিশোধনের পর বিক্রি হলেও চট্টগ্রামভিত্তিক আজমির ভেজিটেবল, নুরজাহান সুপার অয়েল, রুবাইয়া ভেজিটেবল, মাররীন ভেজিটেবল অয়েলস, এমএম ভেজিটেবল, জাসমীর ভেজিটেবল, এসএ অয়েল ও সামন্নোজ সুপার অয়েল ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করেনি। ফলে শুধু ২০১৩ সালেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে ব্যাংকগুলো। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্যালয়ও গুটিয়ে ফেলেছে।
চট্টগ্রামের নুরজাহান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মেরিন ভেজিটেবল অয়েল ও নুরজাহান সুপার অয়েলের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের পাওনা ৮১৩ কোটি টাকা। কিন্তু গ্রুপটি দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে নিলেও অর্থ শোধ করেনি। তেল এনে বিক্রি করেও সে অর্থ অন্য হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
একইভাবে ব্যাংক ঋণে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেনি চট্টগ্রামভিত্তিক এইচআর গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ। বরং সে অর্থে কেনা হয়েছে জমি। প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থায়ন করে বিপাকে পড়েছে ২২টি ব্যাংক।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে দেশে তেলবীজ জাতীয় ফসল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টন ২০ হাজার টন। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি উৎপাদন সরিষার। এর পরই রয়েছে সয়াবিন ও চিনাবাদাম। গত অর্থবছরে সরিষা উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন, সয়াবিন ১ লাখ ১৬ হাজার ও চিনাবাদাম ১ লাখ ১৫ হাজার টন। এছাড়া তিল, তিসি, সূর্যমুখী ও গুজি তিল— সব মিলিয়ে তেলজাতীয় ফসল থেকে আড়াই লাখ টন ভোজ্যতেল উৎপাদন হয়।
ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেলের বাজার নুরজাহান, এস আলম, টিকে, সিটি, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, মেঘনা ও এসএ গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2014/01/22/29738#sthash.byD5SkAX.dpuf
Discussion about this post